হাত ও পায়ের তালু ঘামার কারণ ও সমাধান
ডাঃ ইবরাহিম মোহাম্মদ শরফ • 25 Feb,2026 • 👁 1,529 Views
Category: চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
হাত ও পায়ের তালু বেশি ঘামে কেন? অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার কারণ, লক্ষণ, রোগ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়—জানুন বিস্তারিতভাবে।
ভূমিকা
অনেক মানুষেরই হাত ও পায়ের তালু সবসময় ভেজা ভেজা থাকে। কারও ক্ষেত্রে সামান্য দুশ্চিন্তায় হাত ঘেমে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে কোনো কারণ ছাড়াই তালু ভিজে থাকে। করমর্দন করতে অস্বস্তি, কাগজ ধরলে ভিজে যাওয়া, মোবাইল ধরতে সমস্যা—এগুলো দৈনন্দিন জীবনে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
হাত ও পায়ের তালু ঘামা কখনো স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে, আবার কখনো এটি কোনো রোগের লক্ষণও হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সমস্যাকে অনেকেই লজ্জার কারণে গোপন রাখেন এবং চিকিৎসা নেন না। অথচ সঠিক কারণ জানা গেলে এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব।
World Health Organization-এর তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ঘাম (Hyperhidrosis) একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা, কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকেই ভোগান্তিতে থাকেন।
এই ব্লগে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো—
হাত ও পায়ের তালু ঘামা কী
স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক ঘামের পার্থক্য
হাত ও পায়ের তালু ঘামার প্রধান কারণ
কোন রোগে এই সমস্যা বেশি হয়
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়
হাত ও পায়ের তালু ঘামা বলতে কী বোঝায়?
হাত ও পায়ের তালুতে ঘাম গ্রন্থির সংখ্যা শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি। স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য সামান্য ঘাম হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ঘাম হয়, তখন একে বলা হয় অতিরিক্ত ঘাম বা Hyperhidrosis।
এই ঘাম সাধারণত—
হাতের তালু
পায়ের তালু
বগল
মুখমণ্ডল এ বেশি দেখা যায়।
হাত ও পায়ের তালু ঘামা কি স্বাভাবিক?
সব সময় নয়। কিছু পরিস্থিতিতে হাত-পা ঘামা স্বাভাবিক, যেমন—
প্রচণ্ড গরমে
ব্যায়ামের সময়
ভয় বা উত্তেজনায়
কিন্তু যদি—
ঘাম সবসময় হয়
শীতকালেও তালু ভেজা থাকে
কোনো শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই ঘাম হয়
তাহলে সেটি অস্বাভাবিক এবং কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
হাত ও পায়ের তালু ঘামার প্রধান কারণসমূহ
১. প্রাইমারি হাইপারহাইড্রোসিস (Primary Hyperhidrosis)
এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এই অবস্থায়—
শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে
নির্দিষ্ট কোনো রোগ থাকে না
স্নায়ুর অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণে ঘাম হয়
সাধারণত শৈশব বা কৈশোর বয়স থেকেই শুরু হয় এবং পারিবারিক ইতিহাস থাকতে পারে।
২. অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা
মানসিক চাপ, ভয়, নার্ভাসনেস বা উদ্বেগের সময় শরীরের স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়ে যায়। ফলে—
হাতের তালু
পায়ের তালু
হঠাৎ ঘেমে যায়। পরীক্ষার সময়, সাক্ষাৎকার বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
৩. হরমোনজনিত পরিবর্তন
হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে ঘামের সমস্যা বাড়ে।
বিশেষ করে—
বয়ঃসন্ধিকাল
গর্ভাবস্থা
মেনোপজ
থাইরয়েড সমস্যা এই সময় হাত-পায়ের তালু বেশি ঘামতে পারে।
৪. থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা
হাইপারথাইরয়েডিজমে শরীরের মেটাবলিজম বেড়ে যায়। ফলে—
অতিরিক্ত ঘাম
হাত-পা কাঁপা
ওজন কমে যাওয়া একসাথে দেখা দিতে পারে।
৫. ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিসে স্নায়ুর সমস্যা (Neuropathy) হলে অস্বাভাবিক ঘাম হতে পারে। কখনো অতিরিক্ত, কখনো কম ঘাম—দুইটাই দেখা যায়।
৬. স্থূলতা (Obesity)
অতিরিক্ত ওজন শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে ঘাম বেশি হয়, বিশেষ করে পায়ের তালুতে।
৭. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু ওষুধ ঘাম বাড়াতে পারে, যেমন—
এন্টিডিপ্রেসেন্ট
ব্যথানাশক
জ্বরের ওষুধ
৮. সংক্রমণ বা দীর্ঘস্থায়ী রোগ
যক্ষ্মা (TB)
কিছু ভাইরাল ইনফেকশন
ক্যান্সার এসব রোগে রাতের ঘাম বা অতিরিক্ত ঘাম দেখা যেতে পারে।
হাত ও পায়ের তালু ঘামার সাথে যে লক্ষণগুলো গুরুত্ব দিতে হবে
নিচের লক্ষণগুলোর সাথে ঘাম হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন—
হঠাৎ ও অস্বাভাবিক ঘাম
ওজন কমে যাওয়া
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
হাত কাঁপা
জ্বর বা রাতের ঘাম
হাত ও পায়ের তালু ঘামার চিকিৎসা
১. লাইফস্টাইল পরিবর্তন
হালকা ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনগুলো অনেক উপকার করে—
মানসিক চাপ কমানো
পর্যাপ্ত পানি পান
ঢিলেঢালা কাপড় ব্যবহার
সিনথেটিক মোজা এড়িয়ে চলা
২. অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহার
চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যায়।
৩. ওষুধের চিকিৎসা
কিছু ক্ষেত্রে স্নায়ুর কার্যক্রম কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়, তবে এটি অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে।
৪. আয়োনটোফোরেসিস
এটি একটি বিশেষ থেরাপি, যেখানে হালকা বৈদ্যুতিক প্রবাহ ব্যবহার করে ঘাম কমানো হয়।
৫. বোটক্স ইনজেকশন
গুরুতর ক্ষেত্রে বোটক্স ইনজেকশন দিয়ে সাময়িকভাবে ঘাম নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
৬. অস্ত্রোপচার (খুব বিরল ক্ষেত্রে)
সব চিকিৎসা ব্যর্থ হলে স্নায়ু কেটে দেওয়ার অপারেশন করা হয়, তবে এটি খুব কম ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয়।
হাত ও পায়ের তালু ঘামার ঘরোয়া সমাধান
১. লবণ পানিতে হাত-পা ভিজিয়ে রাখা
লবণ ঘাম গ্রন্থি সংকুচিত করতে সাহায্য করে।
যেভাবে করবেনঃ
কুসুম গরম পানিতে ১–২ চা চামচ লবণ মিশান
১০–১৫ মিনিট হাত ও পা ভিজিয়ে রাখুন
সপ্তাহে ৩–৪ দিন করুন
২. চা পাতার পানিতে হাত-পা ডুবানো
চা পাতায় থাকা ট্যানিন ঘাম কমাতে কার্যকর।
পদ্ধতিঃ
২–৩ টি টি-ব্যাগ বা চা পাতা গরম পানিতে ফুটান
ঠান্ডা হলে হাত-পা ১৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন
৩. কর্নফ্লাওয়ার বা ট্যালকম পাউডার ব্যবহার
পাউডার অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে।
বাইরে যাওয়ার আগে হাত ও পায়ের তালুতে অল্প করে ব্যবহার করুন।
৪. লেবুর রস
লেবুর এসিডিক উপাদান ঘাম কমাতে সাহায্য করে।
ব্যবহারঃ
লেবুর রস তুলায় নিয়ে রাতে হাত ও পায়ের তালুতে লাগান
সকালে ধুয়ে ফেলুন
কাটা বা ক্ষত থাকলে ব্যবহার করবেন না।
৫. বেকিং সোডা
বেকিং সোডা ঘাম ও দুর্গন্ধ দুটোই কমায়।
পদ্ধতিঃ
১ চা চামচ বেকিং সোডা + পানি
পেস্ট তৈরি করে ৫–১০ মিনিট লাগিয়ে রাখুন
সপ্তাহে ২–৩ দিন যথেষ্ট
৬. অ্যালোভেরা জেল
অ্যালোভেরা ত্বক ঠান্ডা রাখে ও ঘাম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
প্রতিদিন রাতে প্রাকৃতিক অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করতে পারেন।
৭. গোলাপ জল
গোলাপ জল ত্বকের pH ব্যালেন্স ঠিক রাখে।
ব্যবহারঃ
তুলায় গোলাপ জল নিয়ে হাত-পায়ের তালুতে লাগান
দিনে ১–২ বার ব্যবহার করা যায়
৮. সঠিক খাবার নির্বাচন
কিছু খাবার ঘাম বাড়ায়।
কম খাবেনঃ
অতিরিক্ত ঝাল
ক্যাফেইন (চা, কফি)
ফাস্ট ফুড
বেশি খাবেনঃ
শাকসবজি
ফল
পর্যাপ্ত পানি
৯. মানসিক চাপ কমান
দুশ্চিন্তা ও নার্ভাসনেস হাত-পা ঘামার বড় কারণ।
নিয়মিত—
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস
নামাজ/ধ্যান
হালকা ব্যায়াম করলে উপকার পাবেন।
১০. কটন মোজা ও আরামদায়ক জুতা ব্যবহার
সিনথেটিক মোজা এড়িয়ে চলুন
প্রতিদিন মোজা পরিবর্তন করুন
পা শুকনো রাখুন
কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন?
দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ঘাম
হঠাৎ শুরু হওয়া ঘাম
ওজন কমে যাওয়া বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হলে
কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাবেন?
হাত ও পায়ের তালু ঘামা প্রতিরোধের উপায়
নিয়মিত হাত-পা পরিষ্কার রাখা
কটন মোজা ব্যবহার
ক্যাফেইন ও ঝাল খাবার কমানো
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
হাত ও পায়ের তালু ঘামা লজ্জার বিষয় নয়, বরং একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। সঠিক সময়ে কারণ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিলে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। দীর্ঘদিন ভোগান্তি না বাড়িয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
ডাঃ ইবরাহিম মোহাম্মদ শরফ
এমবিবিএস, বিসিএস,এমসিপিএস (চর্ম ও যৌন),
ডিডিভি (বিএসএমএমইউ)
কনসালটেন্ট(চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ)
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
FAQ Section
হাত ও পায়ের তালু ঘামা কি রোগ?
সব সময় নয়, তবে অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি Hyperhidrosis হতে পারে।
শীতকালেও হাত ঘামলে কি সমস্যা?
হ্যাঁ, এটি অস্বাভাবিক এবং পরীক্ষা প্রয়োজন।
হাত-পা ঘামা কি থাইরয়েডের লক্ষণ?
হতে পারে, বিশেষ করে অন্য লক্ষণ থাকলে।
এই সমস্যা কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?
কারণভেদে নিয়ন্ত্রণ বা ভালো করা সম্ভব।
কোন ডাক্তার দেখাবো?
মেডিসিন বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ।
ঘরোয়া উপায়ে কি সমাধান সম্ভব?
হালকা ক্ষেত্রে সম্ভব, তবে গুরুতর হলে চিকিৎসা জরুরি।
Related Articles
Continue reading in চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা