এন্ডোমেট্রিওসিস এবং বন্ধ্যাত্ব: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও গর্ভধারণের সম্ভাবনা
এন্ডোমেট্রিওসিস এবং বন্ধ্যাত্ব • 29 Apr,2026 • 👁 114 Views
Category: বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
এন্ডোমেট্রিওসিস কী, কেন হয়, এর লক্ষণ কী, কীভাবে বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে, কী পরীক্ষা করা হয় এবং আধুনিক চিকিৎসায় গর্ভধারণের সম্ভাবনা কতটা, বিস্তারিত জানুন এই পূর্ণাঙ্গ ব্লগে।
এন্ডোমেট্রিওসিস এবং বন্ধ্যাত্ব
নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের জটিল সমস্যাগুলোর মধ্যে এন্ডোমেট্রিওসিস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত রোগ। অনেক নারী বছরের পর বছর তীব্র মাসিক ব্যথা, তলপেটে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি, সহবাসে ব্যথা কিংবা গর্ভধারণে সমস্যার মতো উপসর্গ নিয়ে কষ্ট পেলেও বুঝতে পারেন না যে এর পেছনে এন্ডোমেট্রিওসিস কাজ করছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সন্তান ধারণ করতে পারছেন না, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ একটি বড় কারণ হতে পারে।
এন্ডোমেট্রিওসিস কেবল ব্যথার রোগ নয়; এটি নারীর হরমোন, ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব, জরায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং প্রজননক্ষমতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আশার বিষয় হলো—সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক নারী সফলভাবে মা হতে পারেন। এই লেখায় আমরা এন্ডোমেট্রিওসিস এবং বন্ধ্যাত্বের সম্পর্ক, কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং গর্ভধারণের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
এন্ডোমেট্রিওসিস কী?
এন্ডোমেট্রিওসিস হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে জরায়ুর ভেতরের আবরণী টিস্যুর মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সাধারণত এই টিস্যু ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব, পেলভিক অংশ, জরায়ুর বাইরের আবরণ, অন্ত্রের চারপাশ বা কখনও মূত্রথলির কাছাকাছি দেখা যায়। বিরল ক্ষেত্রে শরীরের অন্য অংশেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মাসিক চক্রের সময় জরায়ুর ভেতরের আবরণ যেভাবে হরমোনের প্রভাবে ঘন হয় এবং পরে রক্তের সঙ্গে বেরিয়ে আসে, জরায়ুর বাইরে থাকা এন্ডোমেট্রিওসিস টিস্যুও একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিন্তু এই রক্ত ও টিস্যু শরীর থেকে বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ না থাকায় ভেতরে প্রদাহ, ফোলা, ক্ষত, আঁশযুক্ত টিস্যু (scar tissue) এবং adhesions তৈরি হতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো ব্যথা তৈরি করার পাশাপাশি প্রজনন অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক গঠন ও কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে।
কেন এন্ডোমেট্রিওসিস হয়?
এন্ডোমেট্রিওসিস হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষকরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেন। সবচেয়ে পরিচিত তত্ত্ব হলো Retrograde Menstruation—যেখানে মাসিকের কিছু রক্ত ফ্যালোপিয়ান টিউব হয়ে পেলভিক ক্যাভিটিতে ফিরে যায় এবং সেখানে থাকা কোষগুলো বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
এছাড়া জিনগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের মা, বোন বা নিকট আত্মীয়ের এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে ঝুঁকি বেশি হতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিকতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেনের প্রভাব, এবং কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এই রোগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর কোষ স্থানান্তর হয়েও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রধান লক্ষণ
এন্ডোমেট্রিওসিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো তীব্র মাসিক ব্যথা। তবে সব ব্যথাই যে এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে হবে তা নয়। এই রোগে ব্যথা সাধারণ মাসিক ব্যথার তুলনায় বেশি তীব্র, দীর্ঘস্থায়ী এবং অনেক সময় ব্যথানাশক ওষুধেও পুরোপুরি কমে না। ব্যথা তলপেট, কোমর, পেলভিক অংশ এমনকি উরু পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
সহবাসের সময় গভীরে ব্যথা অনুভূত হওয়া এন্ডোমেট্রিওসিসের আরেকটি সাধারণ উপসর্গ। অনেক নারীর মলত্যাগ বা প্রস্রাবের সময়ও ব্যথা হয়, বিশেষ করে মাসিকের সময়। দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, দুর্বলতা, ক্লান্তি এবং সন্তান ধারণে সমস্যা—এসবও লক্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে রোগের মাত্রা কম হলেও ব্যথা বেশি হতে পারে, আবার গুরুতর রোগ থাকা সত্ত্বেও লক্ষণ তুলনামূলক কম থাকতে পারে।
এন্ডোমেট্রিওসিস কীভাবে বন্ধ্যাত্বের কারণ হয়?
এন্ডোমেট্রিওসিস এবং বন্ধ্যাত্বের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এই রোগে শরীরের ভেতরে প্রদাহজনিত পরিবেশ তৈরি হয়, যা ডিম্বাণু, শুক্রাণু এবং নিষিক্ত ডিম্বাণুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দিতে পারে।
ডিম্বাশয়ে এন্ডোমেট্রিওমা বা “চকলেট সিস্ট” তৈরি হলে ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ কমে যেতে পারে এবং ডিম্বাণুর মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার ফ্যালোপিয়ান টিউবের চারপাশে আঁশযুক্ত টিস্যু তৈরি হলে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন বাধাগ্রস্ত হয়।
জরায়ুর পরিবেশও প্রভাবিত হতে পারে, যার ফলে নিষিক্ত ডিম্বাণু সহজে জরায়ুতে বসতে পারে না। প্রদাহজনিত রাসায়নিক উপাদান ভ্রূণ স্থাপনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই সব কারণ মিলিয়ে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়।
কোন নারীরা বেশি ঝুঁকিতে?
যাদের অল্প বয়সে মাসিক শুরু হয়েছে, যাদের মাসিক চক্র ছোট, দীর্ঘদিন বেশি রক্তক্ষরণ হয়, পরিবারে এন্ডোমেট্রিওসিসের ইতিহাস আছে, অথবা যারা দীর্ঘদিন তীব্র মাসিক ব্যথায় ভুগছেন—তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
যেসব নারী ১ বছর বা তার বেশি সময় ধরে নিয়মিত চেষ্টা করেও গর্ভধারণ করতে পারছেন না এবং একই সঙ্গে পেলভিক ব্যথা বা তীব্র মাসিক ব্যথা আছে—তাদের ক্ষেত্রে এন্ডোমেট্রিওসিস পরীক্ষা করা জরুরি হতে পারে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রথমে বিস্তারিত ইতিহাস নেওয়া হয়। ব্যথার ধরন, মাসিকের ইতিহাস, সহবাসে ব্যথা, গর্ভধারণে সমস্যা—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এরপর শারীরিক পরীক্ষা করা হয়।
আল্ট্রাসোনোগ্রাফি ডিম্বাশয়ের সিস্ট শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে MRI প্রয়োজন হতে পারে। তবে ছোট ছোট লেশন অনেক সময় ইমেজিংয়ে ধরা পড়ে না।
সবচেয়ে নির্ভুল পরীক্ষা হলো Laparoscopy, যেখানে ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে ভেতরের অবস্থা দেখা হয় এবং প্রয়োজনে একই সঙ্গে চিকিৎসাও করা যায়।
এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর বয়স, উপসর্গ, রোগের মাত্রা এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার ওপর। ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য NSAIDs জাতীয় ওষুধ দেওয়া হতে পারে। হরমোনাল চিকিৎসা যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, প্রোজেস্টিন, GnRH agonist ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়, যা এন্ডোমেট্রিওসিস টিস্যুর বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করে।
যদি রোগী সন্তান নিতে চান, তাহলে চিকিৎসা কৌশল আলাদা হয়। অনেক ক্ষেত্রে Laparoscopic surgery করে লেশন, adhesion ও সিস্ট অপসারণ করা হয়। এতে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
যাদের বয়স বেশি, ovarian reserve কম বা রোগ গুরুতর—তাদের ক্ষেত্রে IVF (In Vitro Fertilization) ভালো বিকল্প হতে পারে।
এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে কি মা হওয়া সম্ভব?
হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব। সব এন্ডোমেট্রিওসিস রোগী বন্ধ্যা হন না। অনেক নারী স্বাভাবিকভাবেই গর্ভধারণ করেন। আবার অনেকের চিকিৎসার পর গর্ভধারণ সম্ভব হয়।
গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা নেওয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর মান কমে যায়, তাই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে দেরি না করাই ভালো।
জীবনযাপনে কী পরিবর্তন উপকারী?
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রদাহ কমাতে সহায়ক খাবার গ্রহণ উপকারী হতে পারে। সবুজ শাকসবজি, ফল, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং কম প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ ভালো।
ধূমপান, অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্স ফ্যাট এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের প্রদাহ বাড়াতে পারে—এসব কমানো প্রয়োজন।
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?
যদি তীব্র মাসিক ব্যথা হয়, সহবাসে ব্যথা থাকে, দীর্ঘদিন পেলভিক ব্যথা থাকে বা ১ বছর চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হয়—তাহলে দ্রুত একজন গাইনি ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নেওয়া উচিত। ৩৫ বছরের বেশি বয়স হলে ৬ মাস চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে মূল্যায়ন করা ভালো।
শেষকথা
এন্ডোমেট্রিওসিস এবং বন্ধ্যাত্ব—এই দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হলেও এটি মানেই যে মা হওয়া অসম্ভব—তা নয়। আধুনিক চিকিৎসা, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো ব্যবস্থা নিলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ে। শরীরের সংকেতকে অবহেলা না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Related Articles
Continue reading in বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
বন্ধ্যাত্ব (Infertility)