গ্লুকোমা: কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
গ্লুকোমা • 09 May,2026 • 👁 233 Views
Category: সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
গ্লুকোমা কী, কেন হয়, চোখের চাপ বাড়লে কী সমস্যা হয়, গ্লুকোমার ব্যথা কেমন, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে করণীয়— জানুন বিস্তারিত ।
গ্লুকোমা
চোখ মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান ইন্দ্রিয়গুলোর একটি। আমরা পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখি, প্রিয়জনের মুখ দেখি, কাজ করি, পড়াশোনা করি—সবকিছুতেই চোখের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এমন কিছু চোখের রোগ আছে, যেগুলো ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দেয়, অথচ শুরুতে রোগী অনেক সময় বুঝতেই পারেন না। এমনই একটি গুরুতর রোগ হলো Glaucoma বা গ্লুকোমা।
গ্লুকোমাকে অনেক সময় “Silent Thief of Sight” বলা হয়, কারণ এটি নীরবে দৃষ্টিশক্তি কমাতে শুরু করে এবং রোগী বুঝে ওঠার আগেই চোখের অপটিক নার্ভে স্থায়ী ক্ষতি করে ফেলতে পারে। সময়মতো শনাক্ত না হলে এটি স্থায়ী অন্ধত্বের কারণও হতে পারে। তবে সুখবর হলো—প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা নিলে গ্লুকোমার ক্ষতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
গ্লুকোমা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা এখনও তুলনামূলক কম। অনেকেই ভাবেন চোখে ব্যথা না হলে বা ঝাপসা না দেখলে চোখে বড় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু গ্লুকোমা অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই শুরু হতে পারে। তাই এই রোগ সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি।
গ্লুকোমা কী?
চোখের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে এক ধরনের তরল তৈরি হয়, যাকে Aqueous Humor বলা হয়। এই তরল চোখের ভেতরের চাপ (Intraocular Pressure) স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে এবং চোখের বিভিন্ন অংশে পুষ্টি সরবরাহ করে।
যদি এই তরল স্বাভাবিকভাবে বের হতে না পারে বা অতিরিক্ত জমে যায়, তাহলে চোখের ভেতরের চাপ বেড়ে যায়। এই বাড়তি চাপ ধীরে ধীরে চোখের গুরুত্বপূর্ণ Optic Nerve-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অপটিক নার্ভই চোখ থেকে মস্তিষ্কে দৃষ্টির তথ্য পৌঁছে দেয়। যখন এই নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন দৃষ্টিশক্তি কমতে শুরু করে। এই অবস্থাকেই গ্লুকোমা বলা হয়।
গ্লুকোমা কেন হয়?
গ্লুকোমার প্রধান কারণ অনেক সময় চোখের ভেতরের চাপ বেড়ে যাওয়া। তবে সবসময় শুধু চাপ বাড়লেই গ্লুকোমা হয় না। কারও কারও স্বাভাবিক চাপেও অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বংশগত কারণ একটি বড় ঝুঁকি। পরিবারে কারও গ্লুকোমা থাকলে অন্য সদস্যদের ঝুঁকি বেশি থাকে।
এছাড়া বয়স ৪০ বছরের বেশি হওয়া, Diabetes Mellitus, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার, চোখে আঘাত, চোখের কিছু জন্মগত গঠনগত সমস্যা এবং অতিরিক্ত মাইনাস পাওয়ার থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গ্লুকোমার ধরন কী কী?
গ্লুকোমার সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো Open-angle glaucoma। এটি ধীরে ধীরে হয় এবং শুরুতে সাধারণত কোনো ব্যথা বা উপসর্গ থাকে না। রোগী বুঝতেই পারেন না যে তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আরেকটি হলো Angle-closure glaucoma, যা হঠাৎ করে তীব্র সমস্যা তৈরি করতে পারে। এতে চোখের চাপ খুব দ্রুত বেড়ে যায় এবং জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
গ্লুকোমা হলে কি হয়?
সব গ্লুকোমায় ব্যথা হয় না। বিশেষ করে Open-angle glaucoma-তে অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনো ব্যথা থাকে না। এ কারণেই এটি বেশি বিপজ্জনক।
তবে Angle-closure glaucoma হলে তীব্র ব্যথা হতে পারে। রোগী চোখের গভীরে প্রচণ্ড চাপধরা ব্যথা অনুভব করতে পারেন। এই ব্যথা অনেক সময় কপাল, মাথার একপাশ বা পুরো মাথায় ছড়িয়ে যেতে পারে।
অনেকের চোখ লাল হয়ে যায়, আলো দেখলে চারপাশে রঙিন বৃত্ত দেখা যায়, চোখ ঝাপসা লাগে, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। ব্যথা এত তীব্র হতে পারে যে রোগী অস্থির হয়ে পড়েন।
চোখে চাপের কারণে চোখ ভারী লাগা, চোখের পেছনে চাপ অনুভব করা বা চোখে অস্বস্তি থাকাও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হতে পারে।
গ্লুকোমার লক্ষণ কী কী?
শুরুর দিকে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। ধীরে ধীরে পার্শ্বদৃষ্টি (peripheral vision) কমতে শুরু করে। রোগী সামনে দেখতে পারেন, কিন্তু পাশে কী আছে তা কম দেখতে পান।
অগ্রসর অবস্থায় ঝাপসা দেখা, আলোতে সমস্যা, রাতে কম দেখা এবং দৃষ্টির ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে “টানেল ভিশন” তৈরি হতে পারে।
হঠাৎ তীব্র গ্লুকোমায় চোখ লাল হওয়া, ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি এবং ঝাপসা দেখা দেখা দিতে পারে।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
গ্লুকোমা নির্ণয়ে চোখের চাপ মাপা, অপটিক নার্ভ পরীক্ষা, দৃষ্টিক্ষেত্র পরীক্ষা এবং Optical Coherence Tomography বা OCT স্ক্যান গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় নিয়মিত চোখ পরীক্ষা ছাড়া এটি ধরা পড়ে না।
চিকিৎসা কী?
চোখের চাপ কমানোই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য। এজন্য eye drops দেওয়া হয়, যা চোখের তরল কম তৈরি করে বা বের হওয়ার পথ সহজ করে।
কিছু ক্ষেত্রে Laser therapy বা অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
চোখে ব্যথা, ঝাপসা দেখা, আলোতে রঙিন বৃত্ত দেখা, চোখ লাল হওয়া বা পরিবারে গ্লুকোমার ইতিহাস থাকলে দ্রুত একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নিন।
শেষকথা
গ্লুকোমা একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুতর চোখের রোগ। এটি অবহেলা করলে স্থায়ী দৃষ্টিহানি হতে পারে। তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, ঝুঁকির কারণগুলো জানা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই চোখের আলো রক্ষার সবচেয়ে বড় উপায়।
Related Articles
Continue reading in সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা