প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি (BPH) কী? লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা
ডাঃ এস.এম. গোলাম মওলা • 06 Mar,2026 • 👁 731 Views
Category: ইউরোলজি সমস্যা
প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি বা BPH কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কী কী লক্ষণ দেখা দেয়, কীভাবে পরীক্ষা করা হয় এবং এর আধুনিক চিকিৎসা কী—এই বিস্তারিত গাইডে জানুন কখন ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি
পুরুষদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে, যার মধ্যে অন্যতম হলো প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি বা Benign Prostatic Hyperplasia (BPH)। এটি একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা যেখানে প্রোস্টেট গ্রন্থি ধীরে ধীরে বড় হয়ে যায় এবং মূত্রনালীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে যে ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের প্রায় অর্ধেকের মধ্যে কোনো না কোনো মাত্রায় প্রোস্টেট বৃদ্ধির সমস্যা দেখা যায়। বয়স ৬০–৭০ বছরে পৌঁছালে এই হার আরও বেশি হয়ে যায়। যদিও এটি সাধারণত ক্যান্সার নয়, তবে চিকিৎসা না করলে মূত্রথলি, কিডনি ও দৈনন্দিন জীবনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক পুরুষ প্রথমে এই সমস্যাকে লজ্জা বা অবহেলার কারণে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু প্রস্রাবের সমস্যা, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাব আটকে যাওয়া বা রাতে বারবার উঠতে হওয়া—এসব লক্ষণকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
এই ব্লগে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি কী, কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কী কী লক্ষণ দেখা যায়, কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয় এবং আধুনিক চিকিৎসা কী।
প্রোস্টেট গ্রন্থি কী?
প্রোস্টেট হলো পুরুষদের প্রজনন ব্যবস্থার একটি ছোট গ্রন্থি যা মূত্রথলির ঠিক নিচে এবং মূত্রনালীর চারপাশে অবস্থিত। সাধারণত এটি আকারে একটি আখরোটের মতো হয়।
এই গ্রন্থির প্রধান কাজ হলো এমন একটি তরল তৈরি করা যা শুক্রাণুকে পুষ্টি জোগায় এবং বীর্যের অংশ হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ প্রোস্টেট গ্রন্থি পুরুষের প্রজনন ক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যেহেতু প্রোস্টেট মূত্রনালীর চারপাশে থাকে, তাই এটি বড় হয়ে গেলে মূত্রনালী চেপে ধরে এবং প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এ কারণেই BPH-এর প্রধান লক্ষণগুলো প্রস্রাবের সাথে সম্পর্কিত।
প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি (BPH) কী?
Benign Prostatic Hyperplasia (BPH) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে প্রোস্টেট গ্রন্থির কোষ সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং গ্রন্থির আকার বড় হয়ে যায়। “Benign” শব্দটির অর্থ হলো এটি ক্যান্সার নয়।
এই বৃদ্ধি সাধারণত ধীরে ধীরে ঘটে এবং অনেক বছর ধরে বাড়তে থাকে। যখন প্রোস্টেট বড় হয়ে মূত্রনালীকে চেপে ধরে, তখন প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের মূত্রসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়।
তবে সব বড় প্রোস্টেটেই যে লক্ষণ থাকবে তা নয়। কিছু পুরুষের প্রোস্টেট অনেক বড় হলেও লক্ষণ কম থাকতে পারে, আবার কারও ছোট বৃদ্ধি হলেও তীব্র উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রোস্টেট বৃদ্ধির কারণ কী?
প্রোস্টেট বৃদ্ধির সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে গবেষণায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
বয়সজনিত হরমোন পরিবর্তন
বয়স বাড়ার সাথে সাথে পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন ও অন্যান্য হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন (DHT) নামক হরমোন প্রোস্টেট কোষের বৃদ্ধি বাড়াতে পারে।
এই হরমোনের প্রভাবে প্রোস্টেট গ্রন্থির কোষ সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং গ্রন্থি বড় হতে থাকে।
জেনেটিক কারণ
পরিবারে যদি বাবার বা বড় ভাইয়ের প্রোস্টেট বৃদ্ধির সমস্যা থাকে, তাহলে অন্য সদস্যদেরও ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে।
জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস প্রোস্টেট সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ
গবেষণায় দেখা গেছে ডায়াবেটিস ও মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে BPH হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
প্রোস্টেট বৃদ্ধি কাদের বেশি হয়?
প্রোস্টেট বৃদ্ধির ঝুঁকি কিছু মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
বয়স ৫০ বছরের বেশি পুরুষ
বয়স যত বাড়ে, প্রোস্টেট বৃদ্ধির সম্ভাবনা তত বাড়ে।
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
স্থূলতা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং প্রোস্টেট বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়।
ডায়াবেটিস রোগী
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মূত্রসংক্রান্ত সমস্যা বেশি দেখা যায়।
শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ব্যক্তি
যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন না, তাদের মধ্যে BPH-এর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
প্রোস্টেট বৃদ্ধির লক্ষণঃ
প্রোস্টেট বড় হলে সাধারণত প্রস্রাবের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়।
ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
প্রোস্টেট বড় হয়ে মূত্রথলির ওপর চাপ সৃষ্টি করলে বারবার প্রস্রাবের বেগ আসে। অনেক সময় দিনে ৮–১০ বার বা তার বেশি প্রস্রাব হতে পারে।
রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ওঠা
রাতে ঘুমের মধ্যে বারবার প্রস্রাবের জন্য উঠতে হলে তাকে Nocturia বলা হয়। এটি BPH-এর একটি সাধারণ লক্ষণ।
প্রস্রাব শুরু করতে দেরি হওয়া
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রস্রাব শুরু করতে সময় লাগে বা চাপ দিতে হয়।
প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হওয়া
প্রস্রাবের ধারা সরু হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক শক্তি থাকে না।
প্রস্রাব শেষে অসম্পূর্ণতার অনুভূতি
প্রস্রাব করার পরও মনে হয় মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয়নি।
হঠাৎ প্রস্রাবের তীব্র চাপ
কখনো কখনো হঠাৎ প্রস্রাবের তীব্র চাপ অনুভূত হয় এবং দ্রুত টয়লেটে যেতে হয়।
প্রস্রাব আটকে যাওয়া
গুরুতর ক্ষেত্রে প্রস্রাব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
প্রোস্টেট বৃদ্ধির সঠিক নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়।
শারীরিক পরীক্ষা
ডাক্তার সাধারণত ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিনেশন (DRE) করে প্রোস্টেটের আকার ও অবস্থা পরীক্ষা করেন।
PSA পরীক্ষা
রক্তে Prostate Specific Antigen (PSA) পরীক্ষা করে প্রোস্টেটের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।
আল্ট্রাসনোগ্রাফি
আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে প্রোস্টেটের আকার ও মূত্রথলির অবস্থা দেখা যায়।
ইউরোফ্লোমেট্রি
এই পরীক্ষায় প্রস্রাবের প্রবাহের গতি পরিমাপ করা হয়।
এমআরআই বা সিটি স্ক্যান
জটিল ক্ষেত্রে আরও বিস্তারিত মূল্যায়নের জন্য এসব পরীক্ষা করা হতে পারে।
প্রোস্টেট বৃদ্ধির চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের তীব্রতার ওপর।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন
প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু পরিবর্তন উপকার দিতে পারে।
ক্যাফেইন কমানো
রাতে বেশি পানি না খাওয়া
নিয়মিত ব্যায়াম
ওজন নিয়ন্ত্রণ
ওষুধ
প্রোস্টেট বৃদ্ধির চিকিৎসায় কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
আলফা ব্লকার
এগুলো মূত্রনালীর পেশি শিথিল করে এবং প্রস্রাব সহজ করে।
৫-আলফা রিডাক্টেজ ইনহিবিটার
এই ওষুধ প্রোস্টেটের আকার ধীরে ধীরে ছোট করতে সাহায্য করে।
মিনিমালি ইনভেসিভ চিকিৎসা
কিছু আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে অপারেশন ছাড়াই সমস্যা কমানো যায়।
লেজার থেরাপি
মাইক্রোওয়েভ থেরাপি
সার্জারি
যদি ওষুধে কাজ না হয় বা জটিলতা দেখা দেয়, তখন অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।
সবচেয়ে প্রচলিত অপারেশন হলো TURP (Transurethral Resection of Prostate)।
এই পদ্ধতিতে মূত্রনালীর মাধ্যমে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে অতিরিক্ত প্রোস্টেট টিস্যু অপসারণ করা হয়।
চিকিৎসা না করলে কী জটিলতা হতে পারে?
চিকিৎসা না করলে কিছু গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রস্রাব সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া
মূত্রথলিতে পাথর
বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ
কিডনি ক্ষতি
কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাবেন?
প্রোস্টেট সমস্যার জন্য সাধারণত ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হয়।
ইউরোলজিস্ট মূত্রনালী, কিডনি এবং পুরুষদের প্রজনন অঙ্গের রোগের চিকিৎসা করেন।
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস (সার্জারি), এমএস (ইউরোলজি)
ইউরোলজি, ল্যাপারোস্কোপিক এবং সার্জারি বিশেষজ্ঞ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত:
প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া
প্রস্রাব আটকে যাওয়া
প্রস্রাবে রক্ত
রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়া
তীব্র তলপেট ব্যথা
প্রোস্টেট বৃদ্ধি প্রতিরোধের উপায়
যদিও পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যায় না, কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে পারে।
নিয়মিত ব্যায়াম
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
ওজন নিয়ন্ত্রণ
পর্যাপ্ত পানি পান
ধূমপান পরিহার
প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি পুরুষদের একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা, বিশেষ করে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর ঝুঁকি বাড়ে। যদিও এটি ক্যান্সার নয়, তবে সময়মতো চিকিৎসা না করলে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
প্রস্রাবের কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সহজেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।
সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই প্রোস্টেট সমস্যার ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
Related Articles
Continue reading in ইউরোলজি সমস্যা
ইউরোলজি সমস্যা
ইউরোলজি সমস্যা
ইউরোলজি সমস্যা