এন্ডোস্কোপি কী? কেন করা হয়, কীভাবে করা হয়, ঝুঁকি ও প্রস্তুতি
এন্ডোস্কোপি • 30 Jan,2026 • 👁 2,050 Views
Category: সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
এন্ডোস্কোপি কী, কেন করা হয়, কীভাবে করা হয়, এতে ব্যথা হয় কি না, ঝুঁকি ও উপকারিতা কী—সব বিস্তারিত জানুন। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ক্যান্সার নির্ণয়ে এন্ডোস্কোপির ভূমিকা।
এন্ডোস্কোপি কী?
এন্ডোস্কোপি হলো একটি আধুনিক চিকিৎসা পরীক্ষা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সরাসরি দেখা যায় কোনো বড় অস্ত্রোপচার ছাড়াই। এই পরীক্ষায় একটি সরু, নমনীয় নল ব্যবহার করা হয়, যার মাথায় থাকে একটি ছোট ক্যামেরা ও আলো। নলটি মুখ, নাক বা পায়ুপথ দিয়ে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। ক্যামেরার মাধ্যমে প্রাপ্ত ছবি সরাসরি মনিটরে দেখা যায়, ফলে ডাক্তার খুব স্পষ্টভাবে রোগ নির্ণয় করতে পারেন।
বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে এন্ডোস্কোপি শুধু রোগ নির্ণয়ের জন্য নয়, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার কাজেও ব্যবহার করা হয়। যেমন—রক্তপাত বন্ধ করা, টিস্যু কেটে নেওয়া (বায়োপসি), পলিপ অপসারণ ইত্যাদি।
এন্ডোস্কোপি কেন করা হয়?
এন্ডোস্কোপি করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো শরীরের ভেতরের সমস্যার সঠিক কারণ নির্ণয় করা। অনেক সময় আলসার, টিউমার, সংক্রমণ বা রক্তপাতের মতো সমস্যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তখন এন্ডোস্কোপি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষ করে দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা, অজানা পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তবমি, কালো পায়খানা, গিলতে কষ্ট, অকারণ ওজন কমে যাওয়া—এসব ক্ষেত্রে এন্ডোস্কোপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ক্যান্সার সন্দেহ হলে নিশ্চিত হওয়ার জন্যও এই পরীক্ষা করা হয়।
এন্ডোস্কোপি কত প্রকার?
এন্ডোস্কোপি শরীরের কোন অংশ দেখা হবে তার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত।
আপার জিআই এন্ডোস্কোপি (Upper GI Endoscopy)
এই পরীক্ষায় মুখ দিয়ে নল ঢুকিয়ে খাদ্যনালী, পাকস্থলী ও ডিওডেনাম (ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ) দেখা হয়। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, রিফ্লাক্স, পাকস্থলীর ক্যান্সার নির্ণয়ে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত।
কোলোনোস্কোপি (Colonoscopy)
পায়ুপথ দিয়ে নল ঢুকিয়ে বৃহদান্ত্র (কোলন) পরীক্ষা করা হয়। দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া, রক্তমিশ্রিত পায়খানা, কোলন ক্যান্সার সন্দেহে এই পরীক্ষা করা হয়।
ব্রঙ্কোস্কোপি
নাক বা মুখ দিয়ে নল ঢুকিয়ে শ্বাসনালী ও ফুসফুস দেখা হয়। দীর্ঘদিনের কাশি, রক্তকাশি বা ফুসফুসের রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত।
সিস্টোস্কোপি
মূত্রনালী ও মূত্রথলি দেখার জন্য করা হয়।
এন্ডোস্কোপি কীভাবে করা হয়?
এন্ডোস্কোপি করার আগে রোগীকে নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকতে বলা হয়, বিশেষ করে আপার এন্ডোস্কোপির ক্ষেত্রে। পরীক্ষার সময় রোগীকে সাধারণত বাম কাতে শুইয়ে রাখা হয়। গলা অসাড় করার জন্য স্প্রে দেওয়া হয়, যাতে বমি ভাব কম হয়।
এরপর ধীরে ধীরে এন্ডোস্কোপ ঢোকানো হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত ৫–১৫ মিনিট সময় নেয়। অনেক ক্ষেত্রে হালকা সেডেশন (ঘুমের ওষুধ) দেওয়া হয়, যাতে রোগী আরাম বোধ করেন। পরীক্ষা শেষে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
এন্ডোস্কোপিতে কি ব্যথা লাগে?
এন্ডোস্কোপি সাধারণত খুব বেশি ব্যথাদায়ক নয়। গলা দিয়ে নল ঢোকানোর সময় অস্বস্তি বা বমি ভাব হতে পারে, তবে এটি সাময়িক। আধুনিক পদ্ধতিতে সেডেশন ব্যবহারের কারণে বেশিরভাগ রোগী কোনো কষ্টই অনুভব করেন না। কোলোনোস্কোপির ক্ষেত্রেও সামান্য পেট ফাঁপা বা চাপ অনুভূত হতে পারে।
কোন কোন রোগে এন্ডোস্কোপি করা হয়?
এন্ডোস্কোপি একটি অত্যন্ত কার্যকর ডায়াগনস্টিক টুল। এর মাধ্যমে নিচের রোগগুলো নির্ণয় করা সম্ভব—
গ্যাস্ট্রিক ও পেপটিক আলসার
গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD)
পাকস্থলী ও খাদ্যনালীর ক্যান্সার
অন্ত্রের পলিপ
রক্তপাতের উৎস
সংক্রমণ ও প্রদাহ
সিলিয়াক ডিজিজ
অনেক সময় বায়োপসি নিয়ে ক্যান্সার নিশ্চিত করা হয়।
এন্ডোস্কোপির ঝুঁকি আছে কি?
এন্ডোস্কোপি সাধারণত নিরাপদ একটি পরীক্ষা। তবে খুব অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি থাকতে পারে। যেমন—হালকা রক্তপাত, সংক্রমণ, খুব বিরল ক্ষেত্রে খাদ্যনালী বা অন্ত্রে ছিদ্র হওয়া। তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে এই ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে।
এন্ডোস্কোপির আগে কী প্রস্তুতি নিতে হয়?
এন্ডোস্কোপির আগে রোগীকে অবশ্যই ডাক্তারের নির্দেশনা মানতে হবে। সাধারণত পরীক্ষার ৬–৮ ঘণ্টা আগে থেকে খাবার বন্ধ রাখতে বলা হয়। নিয়মিত যে ওষুধগুলো খাওয়া হয়, সেগুলো সম্পর্কে ডাক্তারকে জানানো জরুরি, বিশেষ করে ব্লাড থিনার বা ডায়াবেটিসের ওষুধ।
এন্ডোস্কোপির পর করণীয় কী?
পরীক্ষার পর কিছু সময় গলা ঝাঁঝ বা পেট ফাঁপা অনুভূত হতে পারে, যা নিজে থেকেই সেরে যায়। সেডেশন দিলে গাড়ি চালানো বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়। ডাক্তার যে পরামর্শ দেবেন তা অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
FAQ (প্রশ্নোত্তর)
এন্ডোস্কোপি কি নিরাপদ?
হ্যাঁ, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে এন্ডোস্কোপি খুবই নিরাপদ একটি পরীক্ষা।
এন্ডোস্কোপি করতে কত সময় লাগে?
সাধারণত ৫–১৫ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।
এন্ডোস্কোপির পর কি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়?
না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ডে-কেয়ার প্রোসিডিউর।
গ্যাস্ট্রিক রোগে কি এন্ডোস্কোপি জরুরি?
দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক বা সতর্ক সংকেত থাকলে এন্ডোস্কোপি খুবই প্রয়োজনীয়।
এন্ডোস্কোপি কি ক্যান্সার নিশ্চিত করে?
এন্ডোস্কোপি সন্দেহজনক অংশ দেখায় এবং বায়োপসির মাধ্যমে ক্যান্সার নিশ্চিত করা হয়।
এন্ডোস্কোপি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যা দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করে। সঠিক সময়ে এন্ডোস্কোপি করালে অনেক গুরুতর রোগ আগেই ধরা পড়ে এবং জীবন রক্ষা সম্ভব হয়।
Related Articles
Continue reading in সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা