সোরিয়াসিস কী? কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের উপায়
সোরিয়াসিস কী • 29 Dec,2025 • 👁 259 Views
Category: চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
সোরিয়াসিস কী, কেন হয়, এর লক্ষণ কী, কত প্রকার, চিকিৎসা কীভাবে করা হয়, কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাবেন ও কীভাবে সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়—জানুন বিস্তারিত।
সোরিয়াসিস: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের উপায়
সোরিয়াসিস (Psoriasis) একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বারবার ফিরে আসা ত্বকের রোগ, যা শুধু ত্বকেই সীমাবদ্ধ নয়—শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার উপরও প্রভাব ফেলে। অনেকেই সোরিয়াসিসকে সাধারণ চর্মরোগ ভেবে অবহেলা করেন, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
এই ব্লগে আমরা সোরিয়াসিস সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করবো।
সোরিয়াসিস কী?
সোরিয়াসিস হলো একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলভাবে নিজের ত্বক কোষকে আক্রমণ করে। এর ফলে ত্বকের কোষ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত তৈরি হয়। যেখানে সাধারণত একটি ত্বক কোষ তৈরি ও ঝরে যেতে প্রায় ৩–৪ সপ্তাহ সময় লাগে, সেখানে সোরিয়াসিসে তা মাত্র কয়েকদিনেই ঘটে। এবং ত্বকের উপরিভাগে জমে গিয়ে—
লালচে চাকা
সাদা বা রুপালি খোসা
শুষ্ক ও ফাটা ত্বক তৈরি করে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—সোরিয়াসিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়।
সোরিয়াসিস কেন হয়?
সোরিয়াসিস হওয়ার নির্দিষ্ট একটি কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বংশগত প্রবণতা ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি একসাথে কাজ করে এই রোগের সৃষ্টি করে।
১. অটোইমিউন সমস্যা
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ত্বকের কোষ অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বাড়ে।
২. বংশগত কারণ
পরিবারে কারও সোরিয়াসিস থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৩. ট্রিগার ফ্যাক্টর (যেগুলো রোগ বাড়িয়ে দেয়)
অতিরিক্ত মানসিক চাপ
সংক্রমণ (বিশেষ করে গলা ব্যথা বা টনসিল)
ত্বকের আঘাত
ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া
ধূমপান ও অ্যালকোহল
কিছু ওষুধ (স্টেরয়েড হঠাৎ বন্ধ করা, কিছু ব্যথার ওষুধ)
সোরিয়াসিসের লক্ষণ কী কী?
সোরিয়াসিসের লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং রোগের ধরন অনুযায়ী উপসর্গের তীব্রতা কম–বেশি হয়।
সাধারণ লক্ষণ—
লালচে চাকা ও তার উপর সাদা বা রুপালি খোসা
ত্বক শুষ্ক ও ফেটে রক্ত পড়া
আক্রান্ত স্থানে চুলকানি, জ্বালা বা ব্যথা হতে পারে।
ত্বক পুরু হয়ে যাওয়া
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নখ পুরু হয়ে যাওয়া, নখে গর্ত তৈরি হওয়া বা নখ ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা যায়।
সাধারণত যে জায়গাগুলো আক্রান্ত হয়—
কনুই
হাঁটু
মাথার তালু
পিঠ
হাত ও পা
আরও পড়ুনঃ শরীরে চুলকানি: কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
সোরিয়াসিসের প্রকারভেদ
সোরিয়াসিস বিভিন্ন ধরনের হতে পারে—
১. প্লাক সোরিয়াসিস (Plaque Psoriasis)
সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো প্লাক সোরিয়াসিস, যেখানে ত্বকে বড় লালচে চাকা ও মোটা খোসা দেখা যায়।
২. স্কাল্প সোরিয়াসিস
মাথার তালুতে হলে একে স্কাল্প সোরিয়াসিস বলা হয়, যা খুশকির মতো দেখাতে পারে কিন্তু অনেক বেশি পুরু ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
৩. গুটেট সোরিয়াসিস
গুটেট সোরিয়াসিস সাধারণত শিশু ও তরুণদের মধ্যে দেখা যায় এবং ছোট ছোট লাল দানা আকারে প্রকাশ পায়।
৪. পুস্টুলার সোরিয়াসিস
পুস্টুলার সোরিয়াসিসে পুঁজভর্তি ফোসকা তৈরি হয়।
৫. এরিথ্রোডারমিক সোরিয়াসিস
এরিথ্রোডারমিক সোরিয়াসিস একটি বিরল কিন্তু গুরুতর ধরন, যেখানে শরীরের বড় অংশ লাল হয়ে যায়।
৬. সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ত্বকের পাশাপাশি জয়েন্টেও সমস্যা হয়, যাকে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস বলা হয়।
সোরিয়াসিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
সাধারণত—
সোরিয়াসিস নির্ণয়ের জন্য সাধারণত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ত্বক পরীক্ষা করেই রোগ শনাক্ত করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্কিন বায়োপসি করা হতে পারে। যদি জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা বা শক্তভাব থাকে, তবে এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস আছে কিনা তা দেখা হয়।
সোরিয়াসিসের চিকিৎসা কী?
বর্তমানে সোরিয়াসিস সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার কোনো চিকিৎসা নেই, তবে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগটি খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। হালকা সোরিয়াসিসে সাধারণত মলম ও ক্রিম ব্যবহার করা হয়, যেমন স্টেরয়েড ক্রিম, ভিটামিন ডি অ্যানালগ এবং নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার। মাঝারি থেকে গুরুতর ক্ষেত্রে ফটোথেরাপি ব্যবহার করা হয়, যেখানে বিশেষ ধরনের আলো দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। খুব গুরুতর বা জটিল সোরিয়াসিসে ট্যাবলেট, ইনজেকশন বা বায়োলজিক থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। এসব চিকিৎসা অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে করা উচিত।
চিকিৎসা সবসময় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত।
সোরিয়াসিস হলে কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাবেন?
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologist)
সোরিয়াসিস হলে প্রথমেই যে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তিনি হলেন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা ডার্মাটোলজিস্ট। নিয়মিত ফলোআপ এবং চিকিৎসা সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এমবিবিএস, বিসিএস,এমসিপিএস (চর্ম ও যৌন),
ডিডিভি (বিএসএমএমইউ)
কনসালটেন্ট(চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ)
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এমবিবিএস , বিসিএস (স্বাস্থ্য),ডিডিভি (চর্ম ও যৌন রোগ),এমএসিপি (আমেরিকা)
ফেলো ইন ডার্মাটো সার্জারী
এ্যাডভান্স ট্রেনিং ইন সেক্সুয়াল মেডিসিন ( SAASM)
মেম্বার সোরিয়াসিস এওয়ারনেস ক্লাব
চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে দৈনন্দিন করণীয়
চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে ত্বক আর্দ্র রাখা, মানসিক চাপ কমানো, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার এবং স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করলে রোগের তীব্রতা অনেকটাই কমানো যায়। ত্বকে আঘাত এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আঘাতের জায়গায় নতুন করে সোরিয়াসিস দেখা দিতে পারে।
সোরিয়াসিস কি মারাত্মক?
সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, তবে চিকিৎসা না নিলে—
ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি,জয়েন্ট বিকল এমনকি মানসিক অবসাদ হতে পারে।
সোরিয়াসিস সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
সোরিয়াসিস কি ছোঁয়াচে রোগ?
না, সোরিয়াসিস একেবারেই ছোঁয়াচে নয় এবং এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ছড়ায় না।
সোরিয়াসিস কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?
বর্তমানে এটি পুরোপুরি সারানো যায় না, তবে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সোরিয়াসিস কি শুধু ত্বকের রোগ?
না, কিছু ক্ষেত্রে জয়েন্টেও প্রভাব ফেলতে পারে, যাকে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস বলা হয়।
সোরিয়াসিসে কি খাবারের ভূমিকা আছে?
হ্যাঁ, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও অ্যালকোহল রোগের উপসর্গ বাড়াতে পারে।
সোরিয়াসিসে স্টেরয়েড ব্যবহার কি নিরাপদ?
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে।
আপনার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন Doctor Service BD তে
সোরিয়াসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ হলেও সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ফলোআপ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। রোগটি নিয়ে লজ্জা বা ভয় না পেয়ে সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Related Articles
Continue reading in চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা