টনসিলাইটিস কী? কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও টনসিল অপারেশন
Mayo Clinic • 02 Jan,2026 • 👁 828 Views
Category: নাক, কান, গলা রোগ
টনসিলাইটিস কী, কেন হয়, এর লক্ষণ কী, শিশু ও বড়দের টনসিলের সমস্যা, চিকিৎসা ও কখন টনসিল অপারেশন দরকার—জানুন বিস্তারিত।
টনসিলাইটিস (Tonsillitis)
টনসিলাইটিস একটি খুবই সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ গলার রোগ, যা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও প্রাপ্তবয়স্কদেরও আক্রান্ত করতে পারে। বিশেষ করে ঠান্ডা লাগা, ভাইরাল সংক্রমণ বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের সময় টনসিলাইটিসের প্রকোপ বাড়ে। অনেক সময় এটিকে সাধারণ গলা ব্যথা ভেবে অবহেলা করা হয়, কিন্তু বারবার টনসিলাইটিস হলে বা সঠিক চিকিৎসা না নিলে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
টনসিলাইটিস সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা, জটিলতা এড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া অনেক সহজ হয়।
টনসিল কী?
টনসিল হলো গলার দুই পাশে থাকা ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লিম্ফ টিস্যু। এগুলো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অংশ। টনসিল মুখ ও নাক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করা জীবাণু প্রথমে আটকানোর চেষ্টা করে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। বিশেষ করে শিশু বয়সে টনসিল রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
টনসিলাইটিস কী?
টনসিলাইটিস হলো টনসিলের প্রদাহ বা সংক্রমণ। যখন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া টনসিলকে আক্রমণ করে, তখন টনসিল ফুলে যায়, লাল হয়ে ওঠে এবং ব্যথা সৃষ্টি করে। অনেক সময় টনসিলে সাদা বা হলুদ রঙের পুঁজ জমে যায়, যা সংক্রমণের লক্ষণ।
টনসিলাইটিস হালকা হতে পারে, আবার গুরুতর আকারও ধারণ করতে পারে। এটি হঠাৎ শুরু হতে পারে (Acute tonsillitis) অথবা বারবার ফিরে আসতে পারে (Recurrent tonsillitis)।
টনসিলাইটিস কেন হয়?
টনসিলাইটিস হওয়ার প্রধান কারণ হলো সংক্রমণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাইরাস দায়ী হলেও কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে Streptococcus ব্যাকটেরিয়া, টনসিলাইটিসের কারণ হয়।
ভাইরাল সংক্রমণের মধ্যে সর্দি-কাশির ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অ্যাডেনোভাইরাস উল্লেখযোগ্য। ব্যাকটেরিয়াল টনসিলাইটিস তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুতর হতে পারে এবং সময়মতো চিকিৎসা না নিলে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ঠান্ডা পরিবেশ, অপরিচ্ছন্নতা, ধূমপানের ধোঁয়ার সংস্পর্শ এবং ঘন ঘন সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকলে টনসিলাইটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
টনসিলাইটিসের লক্ষণ কী কী?
টনসিলাইটিসের লক্ষণ বয়স ও সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো গলা ব্যথা, যা অনেক সময় এতটাই তীব্র হয় যে খাবার বা পানি গিলতে কষ্ট হয়। টনসিল ফুলে যাওয়া ও লাল হয়ে যাওয়া খুব সাধারণ লক্ষণ।
অনেক ক্ষেত্রে টনসিলে সাদা বা হলুদ পুঁজ দেখা যায়। জ্বর, মাথাব্যথা, কানে ব্যথা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন এবং মুখে দুর্গন্ধও হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে খাওয়ার অরুচি, অতিরিক্ত লালা ঝরা এবং অস্বাভাবিক কান্না দেখা যেতে পারে।
শিশুদের টনসিলাইটিস কেন বেশি হয়?
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি পরিপক্ব না হওয়ায় তারা সহজেই ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। স্কুল বা খেলাধুলার সময় একে অপরের সংস্পর্শে থাকার কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য শিশুদের মধ্যে টনসিলাইটিস বেশি দেখা যায়।
টনসিলাইটিসের ধরন
টনসিলাইটিস সাধারণত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যায়।
অ্যাকিউট টনসিলাইটিস হঠাৎ শুরু হয় এবং সাধারণত কয়েকদিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়।
ক্রনিক টনসিলাইটিস দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং বারবার গলা ব্যথা ও অস্বস্তি তৈরি করে।
রিকরেন্ট টনসিলাইটিস বছরে একাধিকবার টনসিল সংক্রমণ হলে তাকে রিকারেন্ট টনসিলাইটিস বলা হয়।
টনসিলাইটিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
টনসিলাইটিস নির্ণয়ের জন্য সাধারণত গলা পরীক্ষা করাই যথেষ্ট। ডাক্তার টনসিলের অবস্থা, ফোলা, পুঁজ এবং লালচে ভাব দেখেন। প্রয়োজনে গলার সোয়াব টেস্ট করা হয়, যাতে জানা যায় সংক্রমণটি ভাইরাল না ব্যাকটেরিয়াল।
কিছু ক্ষেত্রে রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে, বিশেষ করে জটিলতা বা অন্য সংক্রমণের সন্দেহ থাকলে।
টনসিলাইটিসের চিকিৎসা কী?
টনসিলাইটিসের চিকিৎসা নির্ভর করে সংক্রমণের ধরন ও তীব্রতার উপর। ভাইরাল টনসিলাইটিসে সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান, গরম পানির ভাপ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যথানাশক ও জ্বরের ওষুধে আরাম পাওয়া যায়।
ব্যাকটেরিয়াল টনসিলাইটিস হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হয় এবং সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ মাঝপথে বন্ধ করলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
টনসিলাইটিসে ঘরোয়া যত্ন
হালকা টনসিলাইটিসে কিছু ঘরোয়া পদ্ধতিতে উপকার পাওয়া যায়। গরম লবণ পানির গার্গল গলার ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। কুসুম গরম তরল খাবার গলা আরাম দেয়। ধূমপান ও ঠান্ডা পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত।
টনসিল অপারেশন (Tonsillectomy) কখন প্রয়োজন?
বারবার টনসিলাইটিস হলে বা ক্রনিক টনসিলাইটিসে ভুগলে অনেক সময় টনসিল অপারেশনের প্রয়োজন হয়। সাধারণত বছরে একাধিকবার গুরুতর টনসিল সংক্রমণ হলে, টনসিলের কারণে শ্বাসকষ্ট বা ঘুমের সময় শ্বাস বন্ধ হওয়া (Sleep apnea) হলে, অথবা টনসিলের সংক্রমণ থেকে জটিলতা তৈরি হলে অপারেশন বিবেচনা করা হয়।
টনসিল অপারেশন বর্তমানে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং আধুনিক পদ্ধতিতে করা হয়।
টনসিলাইটিস হলে কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাবেন?
টনসিলাইটিসের জন্য নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নেওয়া উচিত। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে শিশু বিশেষজ্ঞও চিকিৎসায় যুক্ত থাকেন।
এমবিবিএস, বিসিএস(স্বাস্থ্য), এফসিপিএস(ইএনটি), ডিএলও(বিএসএমএমইউ)
ট্রেইনড ইন মাইক্রো ইয়ার সার্জারী (চেন্নাই)
বিশেষজ্ঞ সার্জন
সহযোগী অধ্যাপক, ইএনটি বিভাগ
নাক, কান, গলারোগ বিশেষজ্ঞ ও হেড-নেক সার্জন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, রাজশাহী
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য) এফসিপিএস (নাক, কান-গলা) এমসিপিএস (নাক, কান-গলা)
নাক, কান-গলা ও থাইরয়েড রোগ বিশেষজ্ঞ এবং হেড-নেক সার্জন
সহকারী অধ্যাপক
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, রাজশাহী
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন Doctor Service BD তে
টনসিলাইটিস প্রতিরোধে করণীয়
টনসিলাইটিস পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব না হলেও কিছু সতর্কতা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত হাত ধোয়া, সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকা, মুখে হাত না দেওয়া এবং ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দিলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
টনসিলাইটিস সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
টনসিলাইটিস কি ছোঁয়াচে?
হ্যাঁ, বিশেষ করে ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়াল টনসিলাইটিস ছোঁয়াচে হতে পারে।
টনসিলাইটিস কি নিজে নিজে ভালো হয়?
ভাইরাল টনসিলাইটিস অনেক সময় নিজে নিজে ভালো হয়, তবে ব্যাকটেরিয়াল হলে চিকিৎসা দরকার।
বারবার টনসিল হলে কি অপারেশন করতেই হবে?
সব ক্ষেত্রে নয়, তবে ঘন ঘন গুরুতর সংক্রমণ হলে অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।
শিশুদের টনসিল অপারেশন কি নিরাপদ?
হ্যাঁ, অভিজ্ঞ ENT সার্জনের হাতে এটি নিরাপদ একটি অপারেশন।
টনসিল না থাকলে কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়?
না, অপারেশনের পর শরীর অন্য লিম্ফ টিস্যুর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখে।
টনসিলাইটিস একটি সাধারণ রোগ হলেও বারবার হলে বা অবহেলা করলে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টনসিলাইটিস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। গলা ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্লগের উৎসঃ Mayo Clinic.
Tonsillitis: Symptoms, Causes, and Treatments.
Mayo Foundation for Medical Education and Research.
Related Articles
Continue reading in নাক, কান, গলা রোগ
নাক, কান, গলা রোগ
নাক, কান, গলা রোগ
নাক, কান, গলা রোগ
নাক, কান, গলা রোগ