গর্ভাবস্থায় কি কি পরীক্ষা করতে হয়?
Pregnancy Health • 10 May,2026 • 👁 146 Views
Category: গর্ভকালীন সমস্যা (Pregnancy problems )
গর্ভাবস্থায় কোন কোন পরীক্ষা করতে হয়, কখন করতে হয়, কেন করতে হয়, রিপোর্টে কী বোঝা যায় এবং কোন উপসর্গে জরুরি পরীক্ষা দরকার—বিস্তারিত জানুন।
গর্ভাবস্থায় কি কি পরীক্ষা করতে হয়?
গর্ভাবস্থা একজন নারীর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়। এই সময় শুধু গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি নয়, মায়ের শরীরেও একের পর এক জটিল শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। হরমোনের ওঠানামা, রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি, কিডনি ও হৃদযন্ত্রের কাজের পরিবর্তন, রক্তচাপের ওঠানামা এবং শরীরের পুষ্টির চাহিদা বেড়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে গর্ভাবস্থা এমন একটি সময়, যখন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
অনেকেই ভাবেন, গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর শুধু আল্ট্রাসনোগ্রাম করলেই যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তবে গর্ভাবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা রয়েছে, যেগুলো সময়মতো করা হলে মা ও শিশুর অনেক জটিলতা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। যেমন—রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড সমস্যা, সংক্রমণ, শিশুর বৃদ্ধি, জন্মগত ত্রুটি বা গর্ভকালীন জটিলতা—এসব অনেক কিছুই পরীক্ষার মাধ্যমে আগেভাগে জানা যায়।
নিয়মিত পরীক্ষা শুধু রোগ নির্ণয়ের জন্য নয়; বরং নিরাপদ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখায় গর্ভাবস্থায় কোন কোন পরীক্ষা করতে হয়, কেন করতে হয়, কখন করতে হয় এবং কোন উপসর্গে অতিরিক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
গর্ভাবস্থার প্রথম ভিজিটে কী কী পরীক্ষা করা হয়?
গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর প্রথম চিকিৎসক দেখানোর সময় কিছু বেসিক পরীক্ষা করা হয়। এগুলো মায়ের সার্বিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নে সাহায্য করে।
প্রথমেই রক্তের গ্রুপ ও Rh টাইপিং করা হয়। যদি মায়ের Rh negative হয় এবং বাবার Rh positive হয়, তাহলে ভবিষ্যতে শিশুর রক্তের সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। তাই এটি জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর Complete Blood Count (CBC) পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তশূন্যতা আছে কিনা, সংক্রমণের ইঙ্গিত আছে কিনা এবং প্লাটিলেট কেমন আছে—এসব জানা যায়। Complete Blood Count গর্ভাবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুটিন পরীক্ষা।
রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা হয় ডায়াবেটিস আছে কিনা বোঝার জন্য। আগে থেকেই Diabetes Mellitus থাকলে গর্ভাবস্থায় বাড়তি নজরদারি দরকার হয়।
প্রস্রাব পরীক্ষা
গর্ভাবস্থায় Urine Routine Examination অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে প্রস্রাবে সংক্রমণ, প্রোটিন, চিনি বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা জানা যায়।
প্রস্রাবে প্রোটিন থাকলে Preeclampsia-এর ইঙ্গিত হতে পারে। আবার প্রস্রাবে ইনফেকশন থাকলে সময়মতো চিকিৎসা না নিলে কিডনি সংক্রমণ বা প্রি-টার্ম লেবারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
থাইরয়েড পরীক্ষা
থাইরয়েড হরমোন শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গর্ভাবস্থায় Thyroid Stimulating Hormone পরীক্ষা করে থাইরয়েড ঠিক আছে কিনা দেখা হয়।
থাইরয়েড কম বা বেশি হলে গর্ভপাত, শিশুর বৃদ্ধি কমে যাওয়া বা অন্যান্য জটিলতা হতে পারে।
সংক্রমণ শনাক্ত করার পরীক্ষা
গর্ভাবস্থায় কিছু সংক্রমণ মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই Hepatitis B, Hepatitis C, HIV, Syphilis screening ইত্যাদি পরীক্ষা করা হতে পারে।
এগুলো আগেভাগে জানা গেলে মা ও শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
আল্ট্রাসনোগ্রাম
গর্ভাবস্থায় Obstetric Ultrasonography সবচেয়ে পরিচিত পরীক্ষা। তবে এটি শুধু “বাচ্চা দেখা”র জন্য নয়; বরং শিশুর বয়স, হার্টবিট, বৃদ্ধি, প্লাসেন্টার অবস্থান, জন্মগত ত্রুটি এবং অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমাণ মূল্যায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম দিকে viability scan, পরে anomaly scan এবং শেষের দিকে growth scan করা হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় ব্যথা হলে কী পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে?
গর্ভাবস্থায় ব্যথা সবসময় একই কারণে হয় না। তাই ব্যথার ধরন অনুযায়ী পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
যদি তলপেটে টান ধরার মতো ব্যথা হয়, চিকিৎসক আল্ট্রাসনোগ্রাম করে গর্ভের অবস্থা দেখতে পারেন। কখনও এটি স্বাভাবিক uterine stretching, আবার কখনও miscarriage risk বা ectopic pregnancy-এর ইঙ্গিত হতে পারে।
যদি পেটের ডান পাশে চাপধরা ব্যথা, মাথাব্যথা ও ফোলা থাকে, তাহলে রক্তচাপ, প্রস্রাবে প্রোটিন, লিভার ফাংশন ও প্লাটিলেট পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে—কারণ এটি Preeclampsia-এর লক্ষণ হতে পারে।
কোমর ব্যথা ও প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া থাকলে urine culture লাগতে পারে, কারণ urinary infection থাকতে পারে।
পায়ে ব্যথা ও ফোলা থাকলে কখনও রক্ত জমাট বাঁধা আছে কিনা দেখতে Doppler test করা হতে পারে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের পরীক্ষা
২৪–২৮ সপ্তাহের মধ্যে অনেক গর্ভবতীকে Oral Glucose Tolerance Test করতে বলা হয়। এর মাধ্যমে Gestational Diabetes আছে কিনা বোঝা যায়।
সময়মতো ধরা না পড়লে শিশুর ওজন বেশি হয়ে যাওয়া, প্রসব জটিলতা এবং নবজাতকের শর্করার সমস্যা হতে পারে।
শেষের দিকে কী কী পরীক্ষা লাগে?
গর্ভাবস্থার শেষ দিকে রক্তচাপ, ওজন, শিশুর নড়াচড়া, fetal heart rate, আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং কখনও Non-Stress Test (NST) করা হতে পারে, যা শিশুর হার্টবিট পর্যবেক্ষণ করে।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
যদি তীব্র পেটব্যথা, রক্তপাত, শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, হাত-মুখ ফুলে যাওয়া বা তীব্র মাথাব্যথা হয়, তাহলে দ্রুত একজন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নিতে হবে।
শেষকথা
গর্ভাবস্থায় কি কি পরীক্ষা করতে হয়—এটি জানা প্রতিটি হবু মায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো সঠিক পরীক্ষা করালে মা ও গর্ভের শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়। নিয়মিত ফলোআপ, পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা এবং সচেতন জীবনযাপন—নিরাপদ মাতৃত্বের মূল চাবিকাঠি।
Related Articles
Continue reading in গর্ভকালীন সমস্যা (Pregnancy problems )
গর্ভকালীন সমস্যা (Pregnancy problems )
গর্ভকালীন সমস্যা (Pregnancy problems )
গর্ভকালীন সমস্যা (Pregnancy problems )
গর্ভকালীন সমস্যা (Pregnancy problems )