জন্ডিস হলে কি করবেন? কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
জন্ডিস • 10 Jan,2026 • 👁 633 Views
Category: মেডিসিন রোগ
জন্ডিস কেন হয়, জন্ডিসের লক্ষণ কী, জন্ডিস হলে করণীয় ও বর্জনীয়, কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হবে—জানুন WHO রেফারেন্সসহ বিস্তারিত স্বাস্থ্য ব্লগ।
জন্ডিস কী? (What is Jaundice)
জন্ডিস কোনো রোগ নয়, বরং এটি একটি লক্ষণ (Symptom)। শরীরে যখন রক্তে বিলিরুবিন (Bilirubin) নামক একটি হলুদ রঞ্জক পদার্থের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন চোখের সাদা অংশ, ত্বক ও নখ হলুদ হয়ে যায়—এই অবস্থাকেই জন্ডিস বলা হয়। সাধারণত লিভার, পিত্তনালি বা রক্তের কোনো সমস্যার কারণে জন্ডিস দেখা দেয়।
বিলিরুবিন তৈরি হয় পুরনো লাল রক্তকণিকা ভাঙার ফলে। স্বাভাবিক অবস্থায় লিভার এই বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাত করে পিত্তের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু যখন লিভার ঠিকমতো কাজ করতে পারে না বা পিত্তের পথ বাধাগ্রস্ত হয়, তখন রক্তে বিলিরুবিন জমে গিয়ে জন্ডিস দেখা দেয়।
জন্ডিস কেন হয়? (Causes of Jaundice)
জন্ডিস হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এগুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়।
লিভারের আগে হওয়া জন্ডিস (Pre-hepatic Jaundice)
এই ধরনের জন্ডিস হয় যখন শরীরে অতিরিক্ত লাল রক্তকণিকা ভেঙে যায়। এতে বিলিরুবিনের পরিমাণ এত বেশি বেড়ে যায় যে লিভার তা সামলাতে পারে না।
এটি সাধারণত দেখা যায়—
হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া
কিছু জন্মগত রক্তের রোগে
ম্যালেরিয়া বা কিছু সংক্রমণে
লিভারের সমস্যাজনিত জন্ডিস (Hepatic Jaundice)
এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিলিরুবিন ঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত হতে পারে না।
এর প্রধান কারণগুলো হলো—
ভাইরাল হেপাটাইটিস (A, B, C, E)
লিভার সিরোসিস
ফ্যাটি লিভার
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
লিভারের পরে হওয়া জন্ডিস (Post-hepatic / Obstructive Jaundice)
এই ক্ষেত্রে লিভার ঠিকভাবে কাজ করলেও পিত্ত বের হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি হয়।
যেমন—
পিত্তথলির পাথর
পিত্তনালির টিউমার
প্যানক্রিয়াসের ক্যান্সার
জন্ডিসের লক্ষণ কী কী?
জন্ডিসের লক্ষণ শুধু চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
চোখের সাদা অংশ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া জন্ডিসের সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ। পাশাপাশি প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলুদ বা চায়ের মতো হয়ে যেতে পারে এবং পায়খানার রঙ ফ্যাকাশে বা সাদা হতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দুর্বলতা, ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব, বমি, পেট ব্যথা ও জ্বর দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে সারা শরীরে চুলকানি হয়, বিশেষ করে অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিসে।
জন্ডিস কি ছোঁয়াচে?
সব ধরনের জন্ডিস ছোঁয়াচে নয়।
ভাইরাল হেপাটাইটিস A ও E দ্বারা সৃষ্ট জন্ডিস খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়াতে পারে। আবার হেপাটাইটিস B ও C রক্ত, ইনজেকশন বা অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। তবে পিত্তথলির পাথর, ফ্যাটি লিভার বা অ্যালকোহলের কারণে হওয়া জন্ডিস ছোঁয়াচে নয়।
জন্ডিস হলে করণীয় কি?
জন্ডিস ধরা পড়লে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো অবহেলা না করা। অনেকেই শুধু চোখ হলুদ দেখেই ঘরোয়া চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকেন, যা বিপজ্জনক হতে পারে।
জন্ডিস হলে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা করে বিলিরুবিন, SGPT, SGOT, ALP, ভাইরাল মার্কার ইত্যাদি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ লিভারকে সুস্থ হতে সময় দিতে হয়। প্রচুর পানি পান করতে হবে যাতে শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের হতে পারে।
খাবারের ক্ষেত্রে সহজপাচ্য ও হালকা খাবার খাওয়া উচিত। ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার, ফাস্টফুড ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো হারবাল বা কবিরাজি ওষুধ খাওয়া উচিত নয়, কারণ অনেক ভেষজ উপাদান লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
আরও পড়ুনঃ বাচ্চার ওজন বাড়ছে না? কারণ, করণীয় ও ডাক্তারের পরামর্শ জানুন
জন্ডিস হলে কী খাবেন?
জন্ডিসে খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সহজপাচ্য খাবার যেমন ভাত, ডাল, সেদ্ধ সবজি, ফলমূল খাওয়া ভালো। পর্যাপ্ত শর্করা ও প্রোটিন গ্রহণ করা দরকার, তবে তা যেন লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না ফেলে। ফলের মধ্যে পেঁপে, আপেল, কমলা উপকারী। তবে কাঁচা বা অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
জন্ডিস হলে কী খাবেন না?
জন্ডিস অবস্থায় কিছু খাবার লিভারের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অ্যালকোহল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার, গরুর মাংস, ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও কৃত্রিম রঙযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি।
জন্ডিস কতদিনে ভালো হয়?
জন্ডিস সেরে ওঠার সময় নির্ভর করে মূল কারণের ওপর।
ভাইরাল হেপাটাইটিস A বা E হলে সাধারণত ৪–৮ সপ্তাহে উন্নতি হয়।
হেপাটাইটিস B বা C হলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিসে কখনও কখনও অস্ত্রোপচার বা বিশেষ চিকিৎসা দরকার হয়।
জন্ডিস হলে কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হবে?
জন্ডিস হলে প্রথমে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ (Medicine Specialist) এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এমবিবিএস (এসএসএমসি), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
পিজিটি-কার্ডিওলজি (হৃদরোগ),এমডি, ইন্টারনাল মেডিসিন (পিজি হাসপাতাল)
এমএসিপি (আমেরিকা)
মেডিসিন বশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এমবিবিএস,বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমডি(ইন্টারনাল মেডিসিন)
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক(মেডিসিন)
ইউনিট প্রধান (মেডিসিন ইউনিট -৩)
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, রাজশাহী (এক্স)
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন Doctor Service BD তে
জন্ডিস প্রতিরোধের উপায়
পরিষ্কার ও নিরাপদ পানি পান করা জন্ডিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। খাবার ভালোভাবে রান্না করা ও হাত পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। হেপাটাইটিস B এর টিকা নেওয়া উচিত। নিরাপদ রক্ত গ্রহণ, একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবহার এবং অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক এড়িয়ে চলাও জন্ডিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।
জন্ডিস নিয়ে ভুল ধারণা
অনেকেই মনে করেন জন্ডিস হলে শুধু হলুদ খাবার খেলেই ভালো হয়ে যাবে, যা সম্পূর্ণ ভুল। আবার কেউ কেউ কবিরাজি ওষুধে নির্ভর করেন, যা লিভারের ক্ষতি আরও বাড়াতে পারে। সঠিক চিকিৎসা ছাড়া জন্ডিসকে হালকাভাবে নেওয়া বিপজ্জনক।
জন্ডিস নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
জন্ডিস কি নিজে নিজে ভালো হয়?
কারণভেদে কিছু জন্ডিস ভালো হতে পারে, তবে পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যায় না।
জন্ডিসে গোসল করা যাবে?
হ্যাঁ, পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করা যাবে।
জন্ডিসে ফল খাওয়া যাবে?
হ্যাঁ, তবে পরিষ্কার ও তাজা ফল খেতে হবে।
শিশুদের জন্ডিস কি বিপজ্জনক?
নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্ডিস দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
জন্ডিস একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত, যা শরীরের ভেতরের সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। সময়মতো সঠিক পরীক্ষা, চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জন্ডিস সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থতার সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
Related Articles
Continue reading in মেডিসিন রোগ
মেডিসিন রোগ
মেডিসিন রোগ