পেরিকার্ডাইটিস: লক্ষণ, কারণ, বুকের ব্যথা ও চিকিৎসা
পেরিকার্ডাইটিস • 22 Jun,2026 • 👁 187 Views
Category: হৃদরোগ
পেরিকার্ডাইটিস বা হৃদপিণ্ডের আবরণীর প্রদাহ কী, কেন হয়, এর লক্ষণ, বুকের ব্যথার ধরন, ঝুঁকি, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
পেরিকার্ডাইটিস কী?
পেরিকার্ডাইটিস (Pericarditis) হলো হৃদপিণ্ডকে ঘিরে থাকা পাতলা দ্বিস্তরবিশিষ্ট আবরণী, যাকে পেরিকার্ডিয়াম বলা হয়, তার প্রদাহজনিত একটি রোগ। সাধারণত এই আবরণীর দুই স্তরের মাঝখানে অল্প পরিমাণ তরল থাকে যা হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক চলাচলে সহায়তা করে। যখন কোনো কারণে এই আবরণীতে প্রদাহ হয়, তখন স্তরগুলো একে অপরের সাথে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়, যার মধ্যে বুকের ব্যথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পেরিকার্ডাইটিস হঠাৎ শুরু হতে পারে অথবা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোগীরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
হৃদপিণ্ডের পেরিকার্ডিয়াম কী এবং এর কাজ কী?
পেরিকার্ডিয়াম হলো হৃদপিণ্ডের চারপাশে থাকা একটি সুরক্ষামূলক থলি। এটি হৃদপিণ্ডকে নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখে এবং অতিরিক্ত প্রসারণ থেকে রক্ষা করে। এছাড়া বাইরের সংক্রমণ বা আঘাত থেকে হৃদপিণ্ডকে সুরক্ষা প্রদান করে।
পেরিকার্ডিয়ামের দুটি স্তরের মধ্যে থাকা তরল হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দনের সময় ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করে। যখন এই অংশে প্রদাহ দেখা দেয়, তখন স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং পেরিকার্ডাইটিসের উপসর্গ শুরু হয়।
পেরিকার্ডাইটিস কেন হয়?
পেরিকার্ডাইটিসের অনেক কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় সুনির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তবে ভাইরাসজনিত সংক্রমণকে সবচেয়ে সাধারণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভাইরাল ইনফেকশন যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, কক্সস্যাকি ভাইরাস, অ্যাডেনোভাইরাস কিংবা অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস হৃদপিণ্ডের আবরণীতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, যক্ষ্মা, ছত্রাকজনিত সংক্রমণ এবং কিছু অটোইমিউন রোগও পেরিকার্ডাইটিসের কারণ হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের পর, ওপেন হার্ট সার্জারির পরে, কিডনি বিকল হলে, ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে অথবা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও পেরিকার্ডাইটিস দেখা দিতে পারে।
পেরিকার্ডাইটিসের লক্ষণ
পেরিকার্ডাইটিসের প্রধান এবং সবচেয়ে পরিচিত উপসর্গ হলো বুকের তীব্র ব্যথা। এই ব্যথা সাধারণ হার্ট অ্যাটাকের ব্যথার মতো মনে হলেও এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
ব্যথাটি সাধারণত বুকের মাঝখানে অথবা বাম পাশে অনুভূত হয়। অনেক রোগী এটিকে ছুরিকাঘাতের মতো তীক্ষ্ণ বা ধারালো ব্যথা হিসেবে বর্ণনা করেন। গভীর শ্বাস নেওয়ার সময়, কাশি দিলে অথবা শুয়ে পড়লে ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। আবার সামনের দিকে ঝুঁকে বসলে কিছুটা আরাম অনুভূত হতে পারে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো পেরিকার্ডাইটিসকে অন্যান্য হৃদরোগজনিত ব্যথা থেকে আলাদা করতে সাহায্য করে।
পেরিকার্ডাইটিসের বুকের ব্যথা কেমন হয়?
পেরিকার্ডাইটিসের ব্যথা সাধারণত হঠাৎ শুরু হয়। প্রথমদিকে ব্যথা তীব্র হতে পারে এবং কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অনেক রোগী অনুভব করেন যে বুকের ভেতরে কিছু একটা ঘষা খাচ্ছে বা চাপ সৃষ্টি করছে।
ব্যথাটি কাঁধ, ঘাড়, পিঠ অথবা বাম বাহু পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। গভীর শ্বাস নেওয়ার সময় ব্যথা আরও বাড়ে কারণ তখন ফুসফুসের নড়াচড়ার কারণে প্রদাহযুক্ত পেরিকার্ডিয়ামের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
রাতে শুয়ে থাকার সময় অনেকের ব্যথা বেড়ে যায় এবং ঘুম ব্যাহত হয়। এজন্য অনেক রোগী বালিশ উঁচু করে ঘুমাতে স্বস্তি অনুভব করেন।
শ্বাসকষ্ট: পেরিকার্ডাইটিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ
পেরিকার্ডাইটিসের কারণে অনেক রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। প্রদাহ বৃদ্ধি পেলে অথবা পেরিকার্ডিয়ামের মধ্যে অতিরিক্ত তরল জমা হলে হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
ফলে রোগীরা অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যান, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয় কিংবা বিশ্রাম অবস্থাতেও শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
জ্বর ও শরীরব্যথা কেন হয়?
যদি সংক্রমণজনিত কারণে পেরিকার্ডাইটিস হয়ে থাকে, তাহলে রোগীর জ্বর, দুর্বলতা, শরীরব্যথা এবং ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা প্রথমে সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো উপসর্গ অনুভব করেন। পরে বুকের ব্যথা শুরু হলে রোগটি শনাক্ত হয়।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা Palpitation
প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়ার কারণে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত হতে পারে। রোগীরা বুক ধড়ফড় করা, হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হওয়া অথবা হৃদপিণ্ড দ্রুত চলার অনুভূতি পেতে পারেন।
বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমের সময় এই লক্ষণ বেশি অনুভূত হয়।
পেরিকার্ডাইটিসের বিভিন্ন ধরন
Acute Pericarditis
এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরন। সাধারণত কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয় এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে ভালো হয়ে যায়।
Recurrent Pericarditis
প্রাথমিক রোগ সেরে যাওয়ার পর পুনরায় ফিরে আসলে তাকে রিকারেন্ট পেরিকার্ডাইটিস বলা হয়। এটি রোগীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করতে পারে।
Chronic Pericarditis
তিন মাসের বেশি সময় ধরে প্রদাহ থাকলে তাকে ক্রনিক পেরিকার্ডাইটিস বলা হয়।
Constrictive Pericarditis
এটি একটি জটিল অবস্থা যেখানে পেরিকার্ডিয়াম শক্ত ও মোটা হয়ে যায়। ফলে হৃদপিণ্ড ঠিকমতো প্রসারিত হতে পারে না।
কারা পেরিকার্ডাইটিসে বেশি আক্রান্ত হন?
২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে এই রোগ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তবে নারী, শিশু এবং বয়স্কদেরও হতে পারে।
যাদের অটোইমিউন রোগ, কিডনি রোগ, ক্যান্সার বা সাম্প্রতিক ভাইরাল সংক্রমণের ইতিহাস রয়েছে তাদের ঝুঁকি বেশি।
পেরিকার্ডাইটিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
পেরিকার্ডাইটিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন পরীক্ষার সাহায্য নেন।
ইসিজি (ECG)
পেরিকার্ডাইটিস নির্ণয়ে ইসিজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে বিশেষ ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।
ইকোকার্ডিওগ্রাম
ইকোকার্ডিওগ্রামের মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের চারপাশে তরল জমেছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়।
বুকের এক্স-রে
হৃদপিণ্ডের আকার ও আশপাশের পরিবর্তন মূল্যায়নে সহায়ক।
রক্ত পরীক্ষা
সংক্রমণ, প্রদাহ এবং হৃদপেশির ক্ষতির সূচক নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
সিটি স্ক্যান ও এমআরআই
জটিল ক্ষেত্রে হৃদপিণ্ডের আবরণীর বিস্তারিত অবস্থা মূল্যায়নের জন্য CT Scan বা MRI করা হতে পারে।
পেরিকার্ডাইটিসের সম্ভাব্য জটিলতা
চিকিৎসা না করলে বা রোগ গুরুতর হলে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে।
Pericardial Effusion
পেরিকার্ডিয়ামের মধ্যে অতিরিক্ত তরল জমা হওয়া।
Cardiac Tamponade
অতিরিক্ত তরল জমে হৃদপিণ্ডকে চাপ দিলে এটি প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
Constrictive Pericarditis
দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের ফলে হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
পেরিকার্ডাইটিসের চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা রোগের কারণ এবং তীব্রতার ওপর নির্ভর করে।
প্রদাহ কমানোর ওষুধ
NSAIDs জাতীয় ওষুধ প্রদাহ এবং ব্যথা কমাতে ব্যবহৃত হয়।
কোলচিসিন (Colchicine)
রোগের পুনরাবৃত্তি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কর্টিকোস্টেরয়েড
বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে অটোইমিউন রোগজনিত পেরিকার্ডাইটিসে।
সংক্রমণের চিকিৎসা
ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
অস্ত্রোপচার
গুরুতর জটিলতা দেখা দিলে পেরিকার্ডিয়াল ড্রেনেজ বা Pericardiectomy প্রয়োজন হতে পারে।
পেরিকার্ডাইটিস রোগীর জীবনযাপন কেমন হওয়া উচিত?
রোগ নির্ণয়ের পর কিছুদিন বিশ্রামে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারী ব্যায়াম, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিক চাপ কমাতে হবে।
পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন অত্যন্ত জরুরি। ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করতে হবে।
পেরিকার্ডাইটিস প্রতিরোধের উপায়
যদিও সব ধরনের পেরিকার্ডাইটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবুও কিছু পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ভাইরাল সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া
দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা
ধূমপান পরিহার করা
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা
হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখা
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার না করা
কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে—
হঠাৎ তীব্র বুকের ব্যথা
শ্বাস নিতে মারাত্মক কষ্ট হওয়া
মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া
বুক ধড়ফড়ের সাথে অস্বস্তি বৃদ্ধি
হার্ট অ্যাটাকের মতো উপসর্গ দেখা দেওয়া
পেরিকার্ডাইটিস হলো হৃদপিণ্ডের আবরণীর প্রদাহজনিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ, যার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো তীব্র বুকের ব্যথা। অনেক সময় এটি ভাইরাল সংক্রমণের পরে দেখা দিলেও অটোইমিউন রোগ, কিডনি রোগ, হার্ট অ্যাটাক বা অন্যান্য কারণেও হতে পারে। দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে বুকের ব্যথাকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে শ্বাস নিতে কষ্ট, জ্বর, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে দ্রুত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রাজশাহীতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন Doctor Service BD তে
Related Articles
Continue reading in হৃদরোগ