কোলেস্টেরল বাড়ে কেন
কোলেস্টেরল • 14 May,2026 • 👁 149 Views
Category: হৃদরোগ
কোলেস্টেরল কেন বাড়ে, LDL ও HDL কী, কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা কত, উচ্চ কোলেস্টেরলের লক্ষণ, ঝুঁকি, খাবার ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
কোলেস্টেরল
বর্তমান সময়ে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং রক্তনালীর নানা জটিলতার অন্যতম বড় কারণ হলো রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। অনেক মানুষ নিয়মিত কাজ করেন, স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, কিন্তু হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত হন। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে তাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি ছিল।
কোলেস্টেরল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন কোলেস্টেরল মানেই খারাপ কিছু। বাস্তবে কোলেস্টেরল শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি চর্বিজাতীয় উপাদান, যা হরমোন তৈরি, কোষ গঠন এবং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। সমস্যা তখনই হয়, যখন এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়।
উচ্চ কোলেস্টেরল অনেক সময় নীরবে শরীরের ক্ষতি করতে থাকে। শুরুতে সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না। ধীরে ধীরে এটি রক্তনালীর ভেতরে চর্বি জমিয়ে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ এবং পায়ের রক্তনালীর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই কোলেস্টেরল কেন বাড়ে, এর স্বাভাবিক মাত্রা কত, কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
কোলেস্টেরল কী?
কোলেস্টেরল হলো এক ধরনের চর্বিজাতীয় পদার্থ, যা শরীরের কোষ, হরমোন এবং ভিটামিন ডি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আমাদের শরীর নিজেই লিভারের মাধ্যমে কিছু কোলেস্টেরল তৈরি করে। এছাড়া খাবার থেকেও কোলেস্টেরল আসে।
কোলেস্টেরল রক্তে বিভিন্ন ধরনের lipoprotein-এর মাধ্যমে চলাচল করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
LDL (Low-Density Lipoprotein)
HDL (High-Density Lipoprotein)
Triglyceride
LDL কোলেস্টেরল কী?
LDL-কে সাধারণত “খারাপ কোলেস্টেরল” বলা হয়। কারণ এটি বেশি হলে রক্তনালীর দেয়ালে চর্বি জমতে শুরু করে।
ধীরে ধীরে এই জমা চর্বি রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যাকে atherosclerosis বলা হয়।
HDL কোলেস্টেরল কী?
HDL-কে “ভালো কোলেস্টেরল” বলা হয়। এটি রক্তনালী থেকে অতিরিক্ত চর্বি সরিয়ে লিভারে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।
তাই HDL বেশি থাকা সাধারণত ভালো বলে ধরা হয়।
কোলেস্টেরল বাড়ে কেন?
কোলেস্টেরল বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া। ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত লাল মাংস, প্রসেসড খাবার এবং ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার LDL বাড়াতে পারে।
শারীরিক পরিশ্রম কম করা, দীর্ঘসময় বসে থাকা এবং স্থূলতাও বড় কারণ।
ধূমপান HDL কমিয়ে দেয় এবং খারাপ কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে।
বংশগত কারণেও কারও কোলেস্টেরল বেশি থাকতে পারে। একে Familial Hypercholesterolemia বলা হয়।
এছাড়া Diabetes Mellitus, Hypothyroidism, কিডনি রোগ ও লিভারের কিছু সমস্যার কারণেও কোলেস্টেরল বাড়তে পারে।
কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা কত?
কোলেস্টেরলের মাত্রা সাধারণত Lipid Profile পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়।
Total Cholesterol
স্বাভাবিক: ২০০ mg/dL এর নিচে
Borderline high: ২০০–২৩৯ mg/dL
বেশি: ২৪০ mg/dL বা তার বেশি
LDL (খারাপ কোলেস্টেরল)
আদর্শ: ১০০ mg/dL এর নিচে
Borderline high: ১৩০–১৫৯ mg/dL
বেশি: ১৬০ mg/dL বা তার বেশি
HDL (ভালো কোলেস্টেরল)
পুরুষদের জন্য: ৪০ mg/dL এর বেশি
নারীদের জন্য: ৫০ mg/dL এর বেশি
৬০ mg/dL বা তার বেশি ভালো বলে ধরা হয়
Triglyceride
স্বাভাবিক: ১৫০ mg/dL এর নিচে
বেশি: ২০০ mg/dL বা তার বেশি
উচ্চ কোলেস্টেরলের লক্ষণ কী কী?
উচ্চ কোলেস্টেরল অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ তৈরি করে না। এ কারণেই একে “silent problem” বলা হয়।
তবে রক্তনালীতে চর্বি জমে জটিলতা শুরু হলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে ব্যথা কেমন হয়?
কোলেস্টেরল নিজে সরাসরি ব্যথা তৈরি না করলেও এটি রক্তনালী সংকুচিত করে বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত চলাচল কমিয়ে দিতে পারে। তখন বিভিন্ন ধরনের ব্যথা দেখা দেয়।
যদি হৃদযন্ত্রের রক্তনালী সরু হয়ে যায়, তাহলে বুকের মাঝখানে চাপধরা বা জ্বালাপোড়ার মতো ব্যথা হতে পারে। একে Angina Pectoris বলা হয়।
এই ব্যথা হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা বা পরিশ্রমের সময় বাড়তে পারে এবং বিশ্রাম নিলে কমতে পারে। ব্যথা কখনও বাম হাত, কাঁধ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে যেতে পারে।
পায়ের রক্তনালী সংকুচিত হলে হাঁটার সময় পায়ে টান ধরা বা ব্যথা হতে পারে। কিছুদূর হাঁটার পর ব্যথা বাড়ে এবং বিশ্রাম নিলে কমে যায়। একে peripheral arterial disease-এর লক্ষণ বলা হয়।
মস্তিষ্কের রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কোলেস্টেরল বেশি হলে কী কী ঝুঁকি থাকে?
হার্ট অ্যাটাক
স্ট্রোক
উচ্চ রক্তচাপ
হৃদরোগ
পায়ের রক্তনালীর সমস্যা
কিডনির জটিলতা
কোলেস্টেরল কমাতে কী খাবেন?
শাকসবজি
ফলমূল
ওটস
বাদাম
সামুদ্রিক মাছ
অলিভ অয়েল
আঁশযুক্ত খাবার
ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী হতে পারে।
কী খাবেন না?
ফাস্টফুড
অতিরিক্ত ভাজাপোড়া
ট্রান্স ফ্যাট
অতিরিক্ত লাল মাংস
প্রসেসড খাবার
কোমল পানীয়
জীবনযাপনে কী পরিবর্তন আনবেন?
নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করুন
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ধূমপান বন্ধ করুন
পর্যাপ্ত ঘুমান
মানসিক চাপ কমান
কোলেস্টেরলের পরীক্ষা কখন করবেন?
৪০ বছরের পর নিয়মিত lipid profile পরীক্ষা করা ভালো।
যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা বা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস আছে, তাদের আরও আগে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
কোলেস্টেরলের চিকিৎসা কী?
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের পরিবর্তনই চিকিৎসার প্রথম ধাপ।
প্রয়োজনে চিকিৎসক statin জাতীয় ওষুধ দিতে পারেন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
বুকে ব্যথা, হাঁটলে পায়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা পরীক্ষায় কোলেস্টেরল বেশি এলে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শেষকথা
কোলেস্টেরল বাড়ে কেন—এর উত্তর শুধু খাবারে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনযাপন, বংশগত কারণ এবং অন্যান্য রোগও এর জন্য দায়ী হতে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো গুরুতর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
Related Articles
Continue reading in হৃদরোগ