শিশুর জন্ডিস কী? কেন হয়, কতটা বিপজ্জনক ও করণীয়
শিশুর জন্ডিস • 11 Jan,2026 • 👁 468 Views
Category: শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশুর জন্ডিস কেন হয়? নবজাতকের জন্ডিস কতটা স্বাভাবিক ও কখন বিপজ্জনক? লক্ষণ, চিকিৎসা, ঘরোয়া যত্ন ও কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হবে—WHO গাইডলাইন অনুযায়ী বিস্তারিত জানুন।
শিশুর জন্ডিস কী?
শিশুর জন্ডিস (Pediatric or Neonatal Jaundice) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশুর চামড়া, চোখের সাদা অংশ ও মুখমণ্ডল হলুদাভ হয়ে যায়। এটি মূলত রক্তে বিলিরুবিন (Bilirubin) নামক পদার্থের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘটে। নবজাতক শিশুদের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই শিশুর জন্ডিসকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
বিলিরুবিন কী এবং কেন বাড়ে?
বিলিরুবিন হলো লোহিত রক্তকণিকা ভাঙনের ফলে তৈরি হওয়া একটি হলুদ রঙের পদার্থ। স্বাভাবিক অবস্থায় লিভার এই বিলিরুবিন প্রসেস করে মলের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু শিশুদের লিভার পুরোপুরি পরিপক্ব না হওয়ায় অনেক সময় এই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, ফলে রক্তে বিলিরুবিন জমে জন্ডিস দেখা দেয়।
শিশুর জন্ডিস কেন হয়?
শিশুর জন্ডিস হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এগুলো বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়।
১. ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস (Physiological Jaundice)
এটি নবজাতকদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ। জন্মের ২–৩ দিনের মধ্যে শুরু হয় এবং সাধারণত ৭–১০ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই কমে যায়। এটি মূলত লিভারের অপরিপক্বতার কারণে হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয়।
২. ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধে থাকা বিশেষ উপাদানের কারণে বিলিরুবিন বাড়তে পারে। এটি সাধারণত জন্মের এক সপ্তাহ পর দেখা যায় এবং কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, তবে বেশিরভাগ সময় এটি বিপজ্জনক নয়।
৩. ব্রেস্ট ফিডিং জন্ডিস
শিশু পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পেলে শরীর থেকে বিলিরুবিন বের হতে দেরি হয়। ফলে জন্ডিসের মাত্রা বাড়তে পারে।
৪. রক্তের গ্রুপজনিত সমস্যা (ABO/Rh Incompatibility)
মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপ ভিন্ন হলে শিশুর রক্তকণিকা দ্রুত ভেঙে যায়, ফলে অতিরিক্ত বিলিরুবিন তৈরি হয় এবং তীব্র জন্ডিস দেখা দিতে পারে।
৫. সংক্রমণজনিত জন্ডিস
নবজাতকের সেপসিস, ইউরিন ইনফেকশন বা অন্যান্য সংক্রমণের কারণেও জন্ডিস হতে পারে। এই ধরনের জন্ডিস সাধারণত গুরুতর।
৬. লিভার বা পিত্তনালির জন্মগত সমস্যা
বিলিয়ারি এট্রেসিয়া, হেপাটাইটিস বা অন্যান্য লিভার ডিজিজের কারণে দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস দেখা দিতে পারে।
শিশুর জন্ডিসের লক্ষণ কী?
শিশুর জন্ডিসের লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।
প্রথমে মুখ ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়, পরে বুক, পেট, হাত-পা পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘুম, দুধ খেতে অনীহা, কান্নার স্বর পরিবর্তন, প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হওয়া ও পায়খানা ফ্যাকাসে হওয়াও লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়।
আরও পড়ুনঃ জন্ডিস হলে কি করবেন? কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
শিশুর জন্ডিস কতটা বিপজ্জনক?
সব জন্ডিস বিপজ্জনক নয়। তবে যদি বিলিরুবিনের মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যায়, তাহলে তা মস্তিষ্কে ক্ষতি (Kernicterus) করতে পারে। এতে শিশুর স্থায়ী স্নায়বিক সমস্যা, খিঁচুনি, শ্রবণশক্তি হ্রাস এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। তাই সময়মতো চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।
শিশুর জন্ডিস নির্ণয় কীভাবে করা হয়?
শিশুর জন্ডিস নির্ণয়ের জন্য সাধারণত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে Total Serum Bilirubin (TSB) পরিমাপ করা হয়। প্রয়োজনে ব্লাড গ্রুপ, হিমোগ্লোবিন, লিভার ফাংশন টেস্ট ও সংক্রমণ পরীক্ষা করা হয়।
শিশুর জন্ডিস হলে করণীয় কী?
শিশুর জন্ডিস হলে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
হালকা জন্ডিসে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ ও পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট হতে পারে। তবে বিলিরুবিন বেশি হলে ফোটোথেরাপি (Phototherapy) দেওয়া হয়, যেখানে বিশেষ নীল আলো ব্যবহার করে বিলিরুবিন ভেঙে ফেলা হয়।
গুরুতর ক্ষেত্রে এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশন পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে।
শিশুর জন্ডিসে ঘরোয়া যত্ন কীভাবে করবেন?
শিশুকে বারবার বুকের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ইচ্ছায় কোনো ওষুধ বা কবিরাজি চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। শিশুর প্রস্রাব ও পায়খানা নিয়মিত হচ্ছে কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে।
কখন দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাবেন?
যদি শিশুর জন্ডিস জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শুরু হয়,
যদি জন্ডিস ১৪ দিনের বেশি স্থায়ী হয়,
যদি শিশুর খিঁচুনি, অতিরিক্ত ঘুম বা দুধ না খাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়—তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
শিশুর জন্ডিসে কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হবে?
শিশুর জন্ডিসের ক্ষেত্রে প্রথমে শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician) এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডাঃ মোহতারামা মোস্তারী (মনিকা)
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমসিপিএস (শিশু), এমডি (নবজাতক)
নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য) এমসিপিএস, এফসিপিএস (শিশুরোগ)
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক শিশুরোগ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর: এ-৫৪৫৪৮
এমবিএস (ডিএমসি), এফসিপিএস (শিশুরোগ) ডিসিএইচ (ঢাকা শিশু হাসপাতাল)
শিশু/শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন Doctor Service BD তে
শিশুর জন্ডিস প্রতিরোধের উপায়
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপ, জন্মের পর দ্রুত বুকের দুধ খাওয়ানো, শিশুর ওজন ও প্রস্রাব পর্যবেক্ষণ এবং রক্তের গ্রুপজনিত ঝুঁকি আগে থেকেই জানা থাকলে জন্ডিসের জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শিশুর জন্ডিস নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: নবজাতকের জন্ডিস কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ, অধিকাংশ নবজাতকের হালকা জন্ডিস স্বাভাবিক এবং নিজে থেকেই সেরে যায়।
প্রশ্ন ২: জন্ডিসে শিশুকে রোদে রাখা কি ঠিক?
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোদে রাখা নিরাপদ নয়। ফোটোথেরাপির বিকল্প নয় এটি।
প্রশ্ন ৩: বুকের দুধ বন্ধ করা উচিত কি?
না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বুকের দুধ চালু রাখা উচিত।
প্রশ্ন ৪: জন্ডিস কি সংক্রামক?
না, শিশুর জন্ডিস সংক্রামক নয়।
শিশুর জন্ডিস একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে অধিকাংশ শিশুই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। অবহেলা করলে এটি মারাত্মক জটিলতার কারণ হতে পারে, তাই সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপই হলো নিরাপদ শিশুর প্রথম শর্ত।
ব্লগের উৎসঃ World Health Organization (WHO). Guidelines on Neonatal Jaundice and Hyperbilirubinemia.
Related Articles
Continue reading in শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশু স্বাস্থ্য বার্তা