স্লিপ ডিস্ক (Slip Disc) কি? কারণ, লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা
ডাঃ মোঃ মুনজুর রহমান (শিমুল) • 11 Mar,2026 • 👁 189 Views
Category: স্নায়ুরোগ
স্লিপ ডিস্ক কি, কেন হয়, কী কী লক্ষণ দেখা যায়, কীভাবে চিকিৎসা করা হয় এবং কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানুন এই সম্পূর্ণ গাইডে।
স্লিপ ডিস্ক (Slip Disc)
বর্তমান সময়ে কোমর ব্যথা একটি খুবই সাধারণ সমস্যা। অনেক মানুষ দীর্ঘদিন কোমর ব্যথা বা পিঠের ব্যথায় ভুগে থাকেন। এই ধরনের ব্যথার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো স্লিপ ডিস্ক (Slip Disc)। এটি এমন একটি সমস্যা যেখানে মেরুদণ্ডের মাঝখানে থাকা ডিস্ক তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে।
স্লিপ ডিস্কের কারণে কোমরে তীব্র ব্যথা, পা অবশ হয়ে যাওয়া, ঝিনঝিন অনুভূতি বা চলাফেরায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এই সমস্যা হঠাৎ করে শুরু হয় আবার অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
সঠিক সময় চিকিৎসা না করলে এই সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে যেতে পারে। তাই স্লিপ ডিস্ক সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং এর কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ব্লগে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো স্লিপ ডিস্ক কি, কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কী কী লক্ষণ দেখা যায়, কীভাবে নির্ণয় করা হয় এবং এর চিকিৎসা কী।
মেরুদণ্ডের গঠন ও ডিস্ক কী
মানুষের শরীরের মেরুদণ্ড বা স্পাইন অনেকগুলো হাড় দিয়ে তৈরি। এই হাড়গুলোকে বলা হয় ভার্টিব্রা (Vertebrae)। প্রতিটি হাড়ের মাঝখানে একটি নরম কুশনের মতো অংশ থাকে যাকে বলা হয় ডিস্ক (Disc)।
এই ডিস্কের প্রধান কাজ হলো:
মেরুদণ্ডকে নমনীয় রাখা
শরীরের নড়াচড়া সহজ করা
হাঁটা বা দৌড়ানোর সময় চাপ কমানো
ডিস্কের ভেতরে একটি নরম জেলির মতো পদার্থ থাকে এবং বাইরের অংশ শক্ত ফাইবার দিয়ে তৈরি। যখন এই ডিস্কের ভেতরের অংশ বাইরের দিকে বের হয়ে আসে তখন তাকে স্লিপ ডিস্ক বলা হয়।
স্লিপ ডিস্ক (Slip Disc) কি
স্লিপ ডিস্ক হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে মেরুদণ্ডের মাঝখানে থাকা ডিস্ক তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে।
এই অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনেক সময় Herniated Disc বা Prolapsed Disc বলা হয়।
ডিস্ক সরে গেলে এটি আশেপাশের স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে তীব্র ব্যথা, অবশ ভাব, ঝিনঝিন অনুভূতি বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
স্লিপ ডিস্ক সাধারণত কোমরের নিচের অংশে বেশি দেখা যায়, তবে কখনো কখনো ঘাড়ের অংশেও হতে পারে।
স্লিপ ডিস্ক কেন হয়
বয়সজনিত পরিবর্তন
বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের বিভিন্ন অংশের মতো ডিস্কও দুর্বল হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে ডিস্কের ভেতরের পানি কমে যায় এবং এটি কম নমনীয় হয়ে পড়ে।
ফলে সামান্য চাপ বা আঘাতেও ডিস্ক সরে যেতে পারে।
ভারী জিনিস তোলা
অনেক সময় ভুল পদ্ধতিতে ভারী জিনিস তোলার কারণে মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
বিশেষ করে যারা নিয়মিত ভারী কাজ করেন তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
দীর্ঘ সময় বসে থাকা
বর্তমানে অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় অফিসে বসে কাজ করেন। দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় বসে থাকলে মেরুদণ্ডে চাপ সৃষ্টি হয়।
এর ফলে ধীরে ধীরে ডিস্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
শরীরের অতিরিক্ত ওজন
অতিরিক্ত ওজন মেরুদণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আঘাত বা দুর্ঘটনা
কোনো দুর্ঘটনা বা হঠাৎ আঘাতের কারণে ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যেমন:
গাড়ি দুর্ঘটনা
খেলাধুলার সময় আঘাত
পড়ে যাওয়া
শারীরিক ব্যায়ামের অভাব
নিয়মিত ব্যায়াম না করলে মেরুদণ্ডের আশেপাশের পেশি দুর্বল হয়ে যায়।
এই পেশিগুলো দুর্বল হয়ে গেলে মেরুদণ্ড ঠিকভাবে সাপোর্ট পায় না এবং ডিস্ক সরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
আরও পড়ুনঃ বাচ্চাদের হাড়ের সমস্যা কেন হয়?
স্লিপ ডিস্কের লক্ষণ
কোমরে তীব্র ব্যথা
স্লিপ ডিস্কের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো কোমরে তীব্র ব্যথা।
এই ব্যথা কখনো হঠাৎ শুরু হয় আবার অনেক সময় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা বাড়তে পারে।
পায়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া
অনেক সময় কোমরের ব্যথা পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে সায়াটিকা (Sciatica) বলা হয়।
ব্যথা সাধারণত কোমর থেকে নিতম্ব হয়ে পায়ের নিচ পর্যন্ত যেতে পারে।
ঝিনঝিন বা অবশ ভাব
স্লিপ ডিস্কের কারণে স্নায়ুর উপর চাপ পড়লে পায়ে ঝিনঝিন অনুভূতি বা অবশ ভাব হতে পারে।
এটি সাধারণত স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ।
পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া
কিছু ক্ষেত্রে পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
এর ফলে হাঁটা বা দাঁড়াতে সমস্যা হতে পারে।
বসা বা দাঁড়াতে সমস্যা
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্লিপ ডিস্ক কীভাবে নির্ণয় করা হয়
ডাক্তার সাধারণত রোগীর লক্ষণ শুনে এবং শারীরিক পরীক্ষা করে প্রাথমিকভাবে স্লিপ ডিস্ক সন্দেহ করতে পারেন।
এরপর নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছু পরীক্ষা করা হয়।
এক্স-রে
মেরুদণ্ডের হাড়ের অবস্থা বোঝার জন্য।
এমআরআই (MRI)
ডিস্ক এবং স্নায়ুর অবস্থা বিস্তারিতভাবে দেখতে।
সিটি স্ক্যান
কিছু ক্ষেত্রে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার জন্য।
স্লিপ ডিস্কের চিকিৎসা
স্লিপ ডিস্কের চিকিৎসা সাধারণত কয়েকটি উপায়ে করা হয়।
১. ওষুধ ও ফিজিওথেরাপি
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব।
চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে:
ব্যথানাশক ওষুধ
পেশি শিথিল করার ওষুধ
ফিজিওথেরাপি
বিশ্রাম
ফিজিওথেরাপি মেরুদণ্ডের পেশি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
২. লাইফস্টাইল পরিবর্তন
রোগীদের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
যেমন:
সঠিকভাবে বসা
ভারী জিনিস না তোলা
নিয়মিত ব্যায়াম করা
৩. অস্ত্রোপচার
যদি ওষুধ বা থেরাপিতে কাজ না হয় এবং স্নায়ুর উপর গুরুতর চাপ পড়ে, তাহলে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।
সাধারণত যে সার্জারি করা হয়:
ডিস্কেক্টমি
মাইক্রোডিস্কেক্টমি
ল্যাপারোস্কপিক স্পাইন সার্জারি
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।
দীর্ঘদিন কোমর ব্যথা
পায়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া
পা অবশ হয়ে যাওয়া
হাঁটতে সমস্যা
কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে দেখাবেন
স্লিপ ডিস্ক হলে সাধারণত নিচের বিশেষজ্ঞদের দেখানো হয়।
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ
নিউরোসার্জন
স্লিপ ডিস্ক প্রতিরোধের উপায়
স্লিপ ডিস্ক প্রতিরোধের জন্য কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি।
নিয়মিত ব্যায়াম করা
দীর্ঘ সময় একভাবে বসে না থাকা
সঠিকভাবে ভারী জিনিস তোলা
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
সঠিক ভঙ্গিতে বসা ও ঘুমানো
স্লিপ ডিস্ক একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর সমস্যা হতে পারে যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়।
সঠিক জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সচেতনতা এই রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
যদি দীর্ঘদিন কোমর ব্যথা বা পায়ে ব্যথা দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
Related Articles
Continue reading in স্নায়ুরোগ