কানে শো শো শব্দ কেন হয়?
Tinnitus • 02 May,2026 • 👁 141 Views
Category: নাক, কান, গলা রোগ
কানে শো শো শব্দ বা ভোঁ ভোঁ আওয়াজ কেন হয়, এর কারণ কী, এটি কোন রোগের লক্ষণ কিনা, কীভাবে চিকিৎসা করা হয় এবং কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি
কানে শো শো শব্দ কেন হয়?
অনেক মানুষ মাঝেমধ্যে এমন একটি অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি হন, যেখানে আশপাশে কোনো শব্দ না থাকলেও কানে শো শো, ভোঁ ভোঁ, সিটি বাজানোর মতো, ঝিঁঝিঁ পোকার মতো বা ধুপধুপ ধরনের শব্দ শুনতে পান। এই শব্দ কখনও হালকা হয়, কখনও তীব্র হয়, আবার কখনও একটানা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। কারও ক্ষেত্রে এটি একটি কানে হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে দুই কানেই হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে Tinnitus বলা হয়।
এই সম্পর্কে জানাচ্ছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের কান, নাক ও গলা রোগ বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ আবু রায়হান আলবেরুনী
কানে শো শো শব্দ হওয়া নিজে কোনো আলাদা রোগ নয়; বরং এটি অনেক শারীরিক সমস্যার একটি লক্ষণ হতে পারে। কখনও এটি সাময়িক এবং নিরীহ, আবার কখনও এটি কানের ভেতরের সমস্যা, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক চাপ কিংবা স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। তাই এ ধরনের উপসর্গকে অবহেলা করা উচিত নয়। এই লেখায় কানে শো শো শব্দ হওয়ার কারণ, এর সঙ্গে থাকা লক্ষণ, চিকিৎসা এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
কানে শো শো শব্দ কী?
কানে শো শো শব্দ বলতে বোঝায় এমন শব্দ শোনা, যার বাস্তবে বাইরে কোনো উৎস নেই। অর্থাৎ আশপাশে নীরবতা থাকলেও ব্যক্তি নিজের কানে একটি নির্দিষ্ট ধরনের আওয়াজ শুনতে পান। এই আওয়াজ শো শো, সিটি, ভোঁ ভোঁ, টিকটিক, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ কিংবা হৃদস্পন্দনের মতো হতে পারে।
এটি মূলত শ্রবণতন্ত্রের কোথাও অস্বাভাবিকতা বা মস্তিষ্কে শব্দ প্রক্রিয়াকরণের পরিবর্তনের কারণে হতে পারে। অনেক সময় এটি রাতে ঘুমানোর সময় বেশি অনুভূত হয়, কারণ তখন আশপাশে নীরবতা থাকে এবং ভেতরের শব্দ বেশি স্পষ্ট লাগে।
কানে শো শো শব্দের কারন
কানে শো শো শব্দ হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো শ্রবণশক্তির ক্ষয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কানের ভেতরের সূক্ষ্ম হেয়ার সেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার ফলে মস্তিষ্ক অস্বাভাবিক শব্দ অনুভব করতে পারে।
দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দে থাকা—যেমন কারখানার শব্দ, উচ্চ ভলিউমে গান শোনা, হেডফোনে দীর্ঘ সময় শব্দ শোনা বা বিস্ফোরণের মতো তীব্র শব্দে এক্সপোজার—কানের ভেতরের কোষের ক্ষতি করে tinnitus তৈরি করতে পারে।
অনেক সময় কানে ময়লা জমে যাওয়া (Ear wax blockage) থেকেও শো শো শব্দ হতে পারে। অতিরিক্ত মোম জমে কানের পর্দায় চাপ সৃষ্টি করলে শব্দ, কান বন্ধ লাগা এবং শুনতে সমস্যা হতে পারে।
এছাড়া কানের সংক্রমণ, সাইনাসের সমস্যা, Meniere's Disease, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, ঘাড়ের সমস্যা, এমনকি কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও কানে শো শো শব্দ হতে পারে।
মানসিক চাপ কি কানে শো শো শব্দ বাড়ায়?
হ্যাঁ, মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ tinnitus-এর একটি বড় ট্রিগার হতে পারে। যখন শরীর দীর্ঘদিন স্ট্রেসে থাকে, তখন স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এতে কানে থাকা সামান্য অস্বাভাবিক সিগন্যালও বেশি জোরে অনুভূত হতে পারে।
অনেকেই লক্ষ্য করেন, টেনশন, অনিদ্রা বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সময় কানের শব্দ বেড়ে যায়। আবার কানে শব্দ হওয়ার কারণে ঘুম কমে গেলে এবং উদ্বেগ বাড়লে একটি চক্র তৈরি হয়, যা সমস্যাকে আরও তীব্র করে।
কানে শো শো শব্দের সঙ্গে আর কী কী লক্ষণ থাকতে পারে?
অনেক সময় কানে শব্দের পাশাপাশি শুনতে কম লাগা, কান বন্ধ হয়ে আছে এমন অনুভূতি, মাথা ঘোরা, ভারসাম্য হারানো, কানে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা—এসব লক্ষণও থাকতে পারে।
যদি tinnitus-এর সঙ্গে মাথা ঘোরা ও বমি বমি ভাব থাকে, তাহলে inner ear-এর সমস্যা থাকতে পারে। যদি কানের শব্দ হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হয়, যাকে Pulsatile tinnitus বলা হয়, তাহলে রক্তনালীর সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো ভাসকুলার কারণ থাকতে পারে।
কানে শো শো শব্দ হলে কী পরীক্ষা করা হয়?
সমস্যার কারণ জানতে প্রথমে বিস্তারিত ইতিহাস নেওয়া হয়—কতদিন ধরে হচ্ছে, এক কানে নাকি দুই কানে, শব্দের ধরন কী, শুনতে সমস্যা হচ্ছে কিনা, মাথা ঘোরা আছে কিনা—এসব বিষয় জানা জরুরি।
এরপর কানের ভেতর পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনে Audiometry বা শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে রক্ত পরীক্ষা, থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট, ব্লাড প্রেসার মূল্যায়ন বা MRI/CT Scan প্রয়োজন হতে পারে।
কানে শো শো শব্দের চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা নির্ভর করে মূল কারণের ওপর। যদি কানে ময়লা জমে থাকে, তা পরিষ্কার করলে অনেক সময় সমস্যা কমে যায়। সংক্রমণ থাকলে তার চিকিৎসা করলে উপকার হয়। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে সেটির চিকিৎসা প্রয়োজন।
যদি শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার কারণে tinnitus হয়, তাহলে hearing aid উপকারী হতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে sound therapy, counselling, relaxation techniques এবং cognitive behavioral therapy উপকার দেয়।
যাদের স্ট্রেসের কারণে সমস্যা বাড়ে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ক্যাফেইন কমানো এবং নিয়মিত ব্যায়াম সহায়ক হতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
যদি কানে শো শো শব্দ বারবার হয়, দীর্ঘদিন থাকে, সঙ্গে শুনতে কম লাগে, মাথা ঘোরে, কান ব্যথা হয় বা শব্দ এক কানে বেশি হয়—তাহলে দ্রুত একজন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হঠাৎ করে কানে শব্দ শুরু হওয়া এবং সঙ্গে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া জরুরি অবস্থা হতে পারে—এক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ঘরোয়া যত্নে কী করবেন?
নীরব পরিবেশে tinnitus বেশি বোঝা যায়। তাই একেবারে নীরবতায় না থেকে হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড রাখা অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, লবণ কম খাওয়া, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং উচ্চ শব্দ থেকে কান রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
নিজে থেকে কানে কিছু ঢুকিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করা উচিত নয়, এতে কানের ক্ষতি হতে পারে।
শেষকথা
কানে শো শো শব্দ অনেক সময় সাধারণ কারণে হলেও কখনও এটি শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সংকেত হতে পারে। তাই উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে অবহেলা না করে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। সঠিক কারণ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ এবং হেডনেক সার্জন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
Related Articles
Continue reading in নাক, কান, গলা রোগ
নাক, কান, গলা রোগ
নাক, কান, গলা রোগ
নাক, কান, গলা রোগ
নাক, কান, গলা রোগ