অ্যানাল ফিস্টুলা: কেন হয়, লক্ষণ, চিকিৎসা ও অপারেশন পদ্ধতি
অ্যানাল ফিস্টুলা • 12 Jan,2026 • 👁 277 Views
Category: সার্জারি রোগ
অ্যানাল ফিস্টুলা কী এবং কেন হয়? পায়ুপথে বারবার ঘা, পুঁজ বা ব্যথা হলে কী করবেন? লক্ষণ, ঝুঁকি, আধুনিক চিকিৎসা ও কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাবেন—বিস্তারিত জানুন।
অ্যানাল ফিস্টুলা কী?
অ্যানাল ফিস্টুলা হলো পায়ুপথের ভেতরের অংশ (Anal Canal) ও বাইরের চামড়ার মধ্যে তৈরি হওয়া একটি অস্বাভাবিক নালির মতো পথ। এই নালির মাধ্যমে পুঁজ, রক্ত বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের হতে পারে। সাধারণত এটি দীর্ঘদিনের সংক্রমণ বা অ্যানাল অ্যাবসেস (Anal Abscess) সঠিকভাবে চিকিৎসা না হওয়ার ফলেই তৈরি হয়। অ্যানাল ফিস্টুলা নিজে নিজে সারে না এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সার্জারিই চূড়ান্ত চিকিৎসা।
অ্যানাল ফিস্টুলা কীভাবে তৈরি হয়?
পায়ুপথের ভেতরে ছোট ছোট গ্রন্থি (Anal glands) থাকে, যেগুলো সংক্রমিত হলে সেখানে পুঁজ জমে অ্যাবসেস তৈরি হয়। এই অ্যাবসেস ফেটে গেলে বা অসম্পূর্ণভাবে সেরে উঠলে ভেতর থেকে বাইরে একটি স্থায়ী নালি তৈরি হয়—এটাই অ্যানাল ফিস্টুলা। একবার তৈরি হলে এই নালির ভেতর দিয়ে বারবার সংক্রমণ চলতে থাকে।
অ্যানাল ফিস্টুলা কেন হয়?
অ্যানাল অ্যাবসেসের জটিলতা
অ্যানাল ফিস্টুলার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো পূর্বে হওয়া অ্যানাল অ্যাবসেস। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৩০–৫০% অ্যাবসেসের রোগীর পরবর্তীতে ফিস্টুলা তৈরি হয়।
দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য
কঠিন মল বারবার পায়ুপথে চাপ সৃষ্টি করে ক্ষত তৈরি করতে পারে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস রোগীদের সংক্রমণ সহজে হয় এবং ক্ষত সেরে উঠতে দেরি করে, ফলে ফিস্টুলার ঝুঁকি বেশি।
ক্রোনস ডিজিজ (Crohn’s Disease)
এই দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগে অ্যানাল ফিস্টুলা হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি।
যক্ষ্মা (TB) ও অন্যান্য সংক্রমণ
কিছু ক্ষেত্রে টিবি বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ থেকেও ফিস্টুলা তৈরি হতে পারে।
আগের সার্জারি বা আঘাত
পায়ুপথে পূর্বে কোনো অপারেশন বা আঘাত থাকলে ফিস্টুলার সম্ভাবনা বাড়ে।
অ্যানাল ফিস্টুলার ধরন
অ্যানাল ফিস্টুলা অবস্থান ও জটিলতার ওপর ভিত্তি করে কয়েক ধরনের হয়ে থাকে।
সিম্পল ফিস্টুলা তুলনামূলকভাবে সরল ও একটিমাত্র নালি থাকে।
কমপ্লেক্স ফিস্টুলা-তে একাধিক নালি, গভীর পথ বা মাংসপেশির সঙ্গে জটিল সংযোগ থাকে।
হাই ফিস্টুলা পায়ুপথের গভীর মাংসপেশি পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং চিকিৎসা জটিল হয়।
আরও পড়ুনঃ অ্যাপেন্ডিসাইটিস কী?
অ্যানাল ফিস্টুলার লক্ষণ কী?
অ্যানাল ফিস্টুলার লক্ষণ সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং ধীরে ধীরে বাড়ে।
পায়ুপথের পাশে ছোট ছিদ্র বা ঘা দেখা যায়, যেখান থেকে বারবার পুঁজ বা রক্ত বের হয়।
পায়ুপথে ব্যথা, বিশেষ করে বসলে বা পায়খানার সময়।
দুর্গন্ধযুক্ত তরল নিঃসরণ।
চুলকানি ও ত্বকের জ্বালা।
কিছু ক্ষেত্রে জ্বর ও দুর্বলতা।
কখন অ্যানাল ফিস্টুলা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে?
যদি দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে সংক্রমণ আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে একাধিক নালি তৈরি হয়, অপারেশন জটিল হয় এবং খুব বিরল ক্ষেত্রে রক্তে সংক্রমণ (Sepsis) পর্যন্ত হতে পারে।
অ্যানাল ফিস্টুলা কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা করেন। অনেক সময় বাহ্যিক পরীক্ষাতেই ফিস্টুলার মুখ দেখা যায়।
ডিজিটাল রেকটাল এক্সামিনেশন
আঙুল দিয়ে পায়ুপথ পরীক্ষা করে ভেতরের পথ বোঝার চেষ্টা করা হয়।
এমআরআই (MRI)
জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে এমআরআই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা।
এন্ডোঅ্যানাল আল্ট্রাসাউন্ড
ফিস্টুলার পথ ও গভীরতা নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
অ্যানাল ফিস্টুলার চিকিৎসা কী?
অ্যানাল ফিস্টুলার চিকিৎসা প্রায় সব ক্ষেত্রেই সার্জারিনির্ভর।
ওষুধে কি ফিস্টুলা সারে?
না। অ্যান্টিবায়োটিক সংক্রমণ সাময়িকভাবে কমাতে পারে, কিন্তু ফিস্টুলা সম্পূর্ণ সারাতে পারে না।
ফিস্টুলোটমি (Fistulotomy)
সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। ফিস্টুলার নালিটি কেটে খুলে দেওয়া হয় যাতে ভেতর থেকে ভালোভাবে শুকিয়ে যায়।
সেটন পদ্ধতি (Seton Placement)
জটিল বা গভীর ফিস্টুলায় নালির ভেতর বিশেষ সুতা লাগানো হয়, যাতে ধীরে ধীরে সারে এবং মলধারণ ক্ষমতা নষ্ট না হয়।
লেজার চিকিৎসা (FiLaC)
আধুনিক ও কম ব্যথার পদ্ধতি, যেখানে লেজার দিয়ে ফিস্টুলার পথ বন্ধ করা হয়।
লিফট পদ্ধতি (LIFT Procedure)
মাংসপেশি সংরক্ষণ করে ফিস্টুলা বন্ধ করার আধুনিক সার্জারি।
অপারেশনের পর করণীয় কী?
অপারেশনের পর নিয়মিত ক্ষত পরিষ্কার রাখা, গরম পানিতে বসে সিটজ বাথ নেওয়া, উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মমতো খেতে হবে।
অ্যানাল ফিস্টুলা হলে কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হবে?
অ্যানাল ফিস্টুলার জন্য অবশ্যই জেনারেল সার্জন অথবা কোলোরেক্টাল সার্জন (Colorectal Surgeon) দেখাতে হবে। অভিজ্ঞ সার্জনের মাধ্যমে চিকিৎসা করালে পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কম থাকে।
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য) এমএস (সার্জারী)
জেনারেল ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জন
সহকারী অধ্যাপক (সার্জারী)
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য) এফসিপিএস (সার্জারী)
কনসালটেন্ট (সার্জারী)
জেনারেল, কোলোরেক্টাল ও ল্যাপারোস্কপিক বিশেষজ্ঞ (সার্জন)
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন Doctor Service BD তে
অ্যানাল ফিস্টুলা কি প্রতিরোধ করা যায়?
সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তবে অ্যানাল অ্যাবসেস হলে দ্রুত চিকিৎসা, কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
অ্যানাল ফিস্টুলা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিরক্তিকর রোগ, যা নিজে নিজে ভালো হয় না। লজ্জা বা ভয় না পেয়ে দ্রুত বিশেষজ্ঞ সার্জনের পরামর্শ নিলে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। সময়মতো চিকিৎসাই জটিলতা এড়ানোর একমাত্র উপায়।
অ্যানাল ফিস্টুলা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: অ্যানাল ফিস্টুলা কি ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে?
সাধারণত না, তবে দীর্ঘদিন অবহেলায় রাখলে জটিলতা বাড়তে পারে।
প্রশ্ন ২: অপারেশনের পর কি আবার ফিস্টুলা হতে পারে?
হ্যাঁ, তবে অভিজ্ঞ সার্জনের চিকিৎসায় ঝুঁকি অনেক কমে।
প্রশ্ন ৩: ফিস্টুলা অপারেশন কি খুব ঝুঁকিপূর্ণ?
না, আধুনিক পদ্ধতিতে এটি নিরাপদ ও কার্যকর।
প্রশ্ন ৪: কতদিনে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া যায়?
সাধারণত ২–৬ সপ্তাহের মধ্যে ক্ষত ভালো হয়ে যায়, পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।
Related Articles
Continue reading in সার্জারি রোগ
সার্জারি রোগ
সার্জারি রোগ
সার্জারি রোগ
সার্জারি রোগ