চোখে অঞ্জনি: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও দ্রুত ভালো হওয়ার উপায়
চোখে অঞ্জনি • 30 Apr,2026 • 👁 2,716 Views
Category: সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
চোখে অঞ্জনি (Stye) কেন হয়, এর লক্ষণ কী, কতদিন থাকে, ঘরোয়া যত্ন, চিকিৎসা, কখন ডাক্তার দেখাবেন এবং কীভাবে প্রতিরোধ করবেন—চোখে অঞ্জনি নিয়ে বিস্তারিত জানুন এই পূর্ণাঙ্গ ব্লগে।
চোখে অঞ্জনি
চোখ মানুষের শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গগুলোর একটি। চোখের সামান্য সমস্যা হলেও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। চোখে জ্বালাপোড়া, ব্যথা, লাল হয়ে যাওয়া, চোখের পাতায় ফোলা কিংবা ছোট গুটির মতো ফোঁড়া—এসব উপসর্গ দেখা দিলে অনেকেই বলেন “চোখে অঞ্জনি হয়েছে”। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে সাধারণত Stye বলা হয়। এটি খুব সাধারণ একটি চোখের সমস্যা হলেও অবহেলা করলে ব্যথা, সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অনেকেই মনে করেন চোখে অঞ্জনি হওয়া মানেই হয়তো চোখে ময়লা গেছে বা অতিরিক্ত গরমের কারণে হয়েছে। বাস্তবে এর পেছনে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, চোখের তেলের গ্রন্থি ব্লক হয়ে যাওয়া, চোখে বারবার হাত দেওয়া, অপরিষ্কার প্রসাধনী ব্যবহার, এমনকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো কারণও থাকতে পারে। চোখে অঞ্জনি সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এই লেখায় চোখে অঞ্জনি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
চোখে অঞ্জনি কী?
চোখের পাতার কিনারায় বা চোখের পাতার ভেতরের দিকে ছোট, লালচে, ব্যথাযুক্ত ফোলা গুটি তৈরি হলে তাকে চোখে অঞ্জনি বলা হয়। এটি মূলত চোখের পাতায় থাকা ছোট তেল গ্রন্থি বা লোমকূপে সংক্রমণ বা প্রদাহের কারণে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে Staphylococcus নামক ব্যাকটেরিয়া এ সংক্রমণের জন্য দায়ী।
অঞ্জনি দেখতে ছোট ফোঁড়ার মতো হতে পারে এবং স্পর্শ করলে ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক সময় এর মধ্যে পুঁজ জমে সাদা বা হলদেটে মাথা দেখা যায়। কারও ক্ষেত্রে এটি চোখের পাতার বাইরের অংশে হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে ভেতরের দিকে তৈরি হয়। ভেতরের অঞ্জনি তুলনামূলক বেশি ব্যথাযুক্ত হতে পারে।
চোখে অঞ্জনি কেন হয়?
চোখের পাতায় ছোট ছোট তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি থাকে, যেগুলো চোখকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। যখন এই গ্রন্থির মুখ বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেখানে তেল জমে এবং ব্যাকটেরিয়া সহজে বৃদ্ধি পায়। এর ফলেই সংক্রমণ হয়ে অঞ্জনি তৈরি হতে পারে।
যারা বারবার চোখে হাত দেন, অপরিষ্কার হাতে চোখ চুলকান, মেয়াদোত্তীর্ণ বা নোংরা চোখের মেকআপ ব্যবহার করেন, অন্যের তোয়ালে ব্যবহার করেন বা কন্টাক্ট লেন্স ঠিকমতো পরিষ্কার না করে ব্যবহার করেন—তাদের ঝুঁকি বেশি।
এছাড়া Blepharitis (চোখের পাতার দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ), খুশকি, তৈলাক্ত ত্বক, ডায়াবেটিস, হরমোনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং ঘুমের ঘাটতিও চোখে অঞ্জনি হওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারে।
চোখে অঞ্জনির লক্ষণ কী?
চোখে অঞ্জনি হলে প্রথম দিকে চোখের পাতার নির্দিষ্ট অংশে অস্বস্তি, চুলকানি বা হালকা ব্যথা অনুভূত হতে পারে। ধীরে ধীরে ওই জায়গা লাল হয়ে ফুলে যায় এবং একটি ছোট গুটি দেখা যায়।
ব্যথা সাধারণত স্পর্শ করলে বেশি বোঝা যায়, তবে অনেকের ক্ষেত্রে চোখের পাতা ভারী লাগা বা চোখ বন্ধ করতে অস্বস্তি হতে পারে। চোখ দিয়ে পানি পড়া, আলোতে অস্বস্তি, চোখে কিছু আটকে আছে এমন অনুভূতি এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখের পাতা কিছুটা আঠালো লাগা—এসবও দেখা দিতে পারে।
যদি সংক্রমণ বেশি হয়, তাহলে পুরো চোখের পাতা ফুলে যেতে পারে। কখনও কখনও গুটির মধ্যে পুঁজ জমে এবং কয়েক দিনের মধ্যে ফেটে গিয়ে পুঁজ বের হয়ে আরাম লাগে।
চোখে অঞ্জনি হলে ব্যথা কেমন হয়?
চোখে অঞ্জনির ব্যথা সাধারণত স্থানীয়ভাবে শুরু হয়—অর্থাৎ চোখের পাতার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় চাপ দিলে বা চোখ পিটপিট করলে ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। শুরুতে এটি হালকা জ্বালা বা টান ধরার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা তীব্র হতে পারে।
অনেক সময় চোখের পাতা এতটাই ফোলা হয় যে চোখ পুরোপুরি খুলতে কষ্ট হয়। কারও ক্ষেত্রে চোখের চারপাশে ভারী চাপের মতো অনুভূতি হয়। যদি প্রদাহ আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে চোখের আশেপাশের অংশেও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তবে সাধারণ অঞ্জনিতে চোখের ভেতরের দৃষ্টিশক্তি সাধারণত ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
চোখে অঞ্জনি কতদিন থাকে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চোখে অঞ্জনি ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। অনেক সময় ৩–৫ দিনের মধ্যে গুটি নরম হয়ে পুঁজ বেরিয়ে যায় এবং ব্যথা কমে আসে।
তবে যদি গুটি শক্ত হয়ে দীর্ঘদিন থাকে বা ব্যথা কমে গেলেও ফোলা গুটি থেকে যায়, তখন সেটি Chalazion এ পরিণত হতে পারে। এটি সাধারণত সংক্রমণের চেয়ে ব্লক হওয়া তেল গ্রন্থির কারণে হয় এবং অনেক সময় ছোট অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
চোখে অঞ্জনি হলে কী করবেন?
চোখে অঞ্জনি হলে সবচেয়ে কার্যকর ঘরোয়া যত্ন হলো গরম সেঁক দেওয়া। পরিষ্কার নরম কাপড় হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে ১০–১৫ মিনিট চোখের ওপর ধরে রাখলে জমে থাকা তেল নরম হয়, রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং পুঁজ বের হতে সাহায্য করে। দিনে ৩–৪ বার এটি করলে দ্রুত আরাম মিলতে পারে।
চোখ পরিষ্কার রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। চোখে হাত দেওয়া, চুলকানো বা গুটি চাপ দিয়ে ফাটানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে যেতে পারে। চোখের মেকআপ ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং কন্টাক্ট লেন্স সাময়িকভাবে না পরা ভালো।
পরিষ্কার তোয়ালে ব্যবহার করা এবং হাত ধুয়ে চোখে স্পর্শ করা সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।
চোখে অঞ্জনির চিকিৎসা কী?
যদি অঞ্জনি বড় হয়, খুব ব্যথা হয় বা কয়েক দিনের মধ্যে না কমে, তাহলে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক প্রয়োজন হলে অ্যান্টিবায়োটিক আই অয়েন্টমেন্ট বা ড্রপ দিতে পারেন।
কিছু ক্ষেত্রে প্রদাহ বেশি হলে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকও লাগতে পারে। যদি পুঁজ জমে শক্ত হয়ে যায় এবং নিজে থেকে না ফাটে, তাহলে ছোট একটি চিকিৎসা পদ্ধতিতে সেটি বের করে দেওয়া হতে পারে।
বারবার অঞ্জনি হলে রক্তে শর্করা পরীক্ষা, চোখের পাতার পরিচর্যা এবং অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ আছে কিনা তা দেখা প্রয়োজন হতে পারে।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
যদি চোখের পাতা অত্যধিক ফুলে যায়, চোখ লাল হয়ে দৃষ্টিতে সমস্যা হয়, জ্বর আসে, ব্যথা খুব বেশি হয় বা সংক্রমণ চোখের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যায়—তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
একই জায়গায় বারবার অঞ্জনি হওয়া, দীর্ঘদিন গুটি না কমা বা চোখের পাতায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলেও পরীক্ষা করা উচিত।
চোখে অঞ্জনি প্রতিরোধের উপায়
চোখ পরিষ্কার রাখা, নোংরা হাতে চোখে স্পর্শ না করা, ব্যক্তিগত তোয়ালে ব্যবহার করা, কন্টাক্ট লেন্স পরিষ্কার রাখা এবং পুরনো মেকআপ ব্যবহার না করা—এসব অভ্যাস চোখে অঞ্জনি প্রতিরোধে খুব কার্যকর।
যাদের চোখের পাতায় খুশকির মতো আবরণ জমে বা বারবার প্রদাহ হয়, তারা নিয়মিত চোখের পাতার পরিচর্যা করলে উপকার পান। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
শেষকথা
চোখে অঞ্জনি সাধারণ সমস্যা হলেও এটি বেশ অস্বস্তিকর এবং অনেক সময় ব্যথাদায়ক হতে পারে। সঠিক যত্ন নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুত ভালো হয়ে যায়। তবে বারবার হলে বা জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। চোখ অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ—তাই যেকোনো সংক্রমণ বা ফোলা বিষয়কে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়।
Related Articles
Continue reading in সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা
সাধারণ স্বাস্থ্য বার্তা