কিডনিতে পাথর: কী, কেন হয়, লক্ষণ, অপারেশন কখন লাগে ও প্রাকৃতিক করণীয়
কিডনিতে পাথর • 28 Dec,2025 • 👁 187 Views
Category: কিডনি রোগ
কিডনিতে পাথর কেন হয়, কী কী লক্ষণ দেখা দেয়, কখন অপারেশন প্রয়োজন, কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হবে ও প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ থাকার উপায়—জানুন বিস্তারিত।
কিডনিতে পাথর
কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) এমন একটি সমস্যা যা শুরুতে নীরব থাকলেও হঠাৎ তীব্র ব্যথা ও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপারেশন ছাড়াই এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই লেখায় আমরা ধাপে ধাপে জানবো—
কিডনিতে পাথর কী
কেন হয়
লক্ষণ কী
কখন অপারেশন প্রয়োজন
কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হবে
এবং প্রাকৃতিকভাবে কী করলে সুস্থ থাকা যায়
কিডনিতে পাথর কাকে বলে?
কিডনিতে পাথর হলো প্রস্রাবের মধ্যে থাকা কিছু খনিজ ও লবণ (যেমন ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড) একত্র হয়ে তৈরি হওয়া কঠিন স্ফটিক। সময়ের সঙ্গে এগুলো বড় হয়ে পাথরের মতো আকার ধারণ করে।
পাথর তৈরি হতে পারে—
কিডনিতে
ইউরেটারে (কিডনি থেকে মূত্রাশয়ে যাওয়ার নালি)
মূত্রাশয় বা প্রস্রাবের নালিতেও
পাথরের আকার খুব ছোট বালুকণার মতো হতে পারে, আবার কয়েক সেন্টিমিটার বড়ও হতে পারে।
কিডনিতে পাথর কেন হয়?
কিডনিতে পাথর হওয়ার মূল কারণ হলো প্রস্রাবের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া ও খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া।
প্রধান কারণগুলো হলো—
১. পর্যাপ্ত পানি না পান করা
সবচেয়ে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ
পানি কম হলে প্রস্রাব ঘন হয়
খনিজ জমে গিয়ে পাথর তৈরি হয়
২. অতিরিক্ত লবণ ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস
বেশি লবণ
ফাস্টফুড
প্রসেসড খাবার
এসব কিডনিতে ক্যালসিয়াম জমার ঝুঁকি বাড়ায়।
৩. অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন
লাল মাংস
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাংস
এতে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গিয়ে পাথর হতে পারে।
৪. পারিবারিক ইতিহাস
পরিবারে কারও কিডনিতে পাথর থাকলে ঝুঁকি বেশি
৫. কিছু শারীরিক সমস্যা
ইউরিক অ্যাসিড বেশি থাকা
ডায়াবেটিস
স্থূলতা
দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকা
৬. প্রস্রাব চেপে রাখার অভ্যাস
কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়
পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে
আরও পড়ুনঃ কিডনি রোগ: লক্ষণ, কারণ, প্রতিরোধ
কিডনিতে পাথরের লক্ষণ কী?
ছোট পাথরে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে পাথর নড়াচড়া করলে বা প্রস্রাবের নালিতে আটকে গেলে তীব্র উপসর্গ দেখা দেয়।
সাধারণ লক্ষণগুলো—
কোমরের এক পাশে বা দুই পাশে তীব্র ব্যথা হওয়া
ব্যথা তলপেট, কুঁচকি বা উরু পর্যন্ত ছড়িয়ে যাওয়া
প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা
প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া
ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ পাওয়া
বমি বা বমিভাব
জ্বর ও কাঁপুনি (সংক্রমণ হলে) হওয়া
জ্বরের সাথে ব্যথা হলে এটি জরুরি অবস্থা।
কিডনিতে পাথর কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
ডাক্তার সাধারণত—
আল্ট্রাসনোগ্রাফি
এক্স-রে KUB
CT স্ক্যান (প্রয়োজনে)
প্রস্রাব ও রক্ত পরীক্ষা
এর মাধ্যমে পাথরের আকার, অবস্থান ও ক্ষতির মাত্রা নির্ণয় করেন।
কখন কিডনিতে পাথরের অপারেশন করতে হয়?
সব কিডনি স্টোনে অপারেশন লাগে না।
অপারেশন প্রয়োজন হয় যখন—
পাথরের আকার ৬–৭ মিমি-এর বেশি
দীর্ঘদিন নিজে নিজে বের হচ্ছে না
বারবার তীব্র ব্যথা হচ্ছে
কিডনিতে সংক্রমণ বা কিডনি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে
প্রস্রাবের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি—
ESWL: শক ওয়েভ দিয়ে পাথর ভাঙা
Ureteroscopy: নালি দিয়ে যন্ত্র ঢুকিয়ে পাথর বের করা
PCNL: বড় পাথরের ক্ষেত্রে সার্জারি
কিডনিতে পাথর হলে কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হবে?
ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ (Urologist) এই রোগের প্রধান চিকিৎসক।
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমএস (ইউরোলজি)
কিডনী, ইউরেটার, ব্লাডার, প্রোস্টেট এন্ড্রোলজি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ডাঃ এম. এম. হাসনাত পারভেজ (শুভ)
এমবিবিএস, বিসিএস, এমএস (ইউরোলজি)
কিডনী, মুত্রনালী, প্রোস্টেট ,পুরুষ জননতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ও সার্জন
সহকারী অধ্যাপক
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এফসিপিএস (সার্জারী) এমএস (ইউরোলজি)
ইউরোলজি, ল্যাপারোস্কপিক ও সার্জারী বিশেষজ্ঞ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী
প্রয়োজনে—
নেফ্রোলজিস্ট (কিডনি বিশেষজ্ঞ) রোগের জটিলতা অনুযায়ী যুক্ত হন।
এমবিবিএস, ডিসিএম,এমডি(নেফ্রোলজি),
এফএসিপি(আমেরিকা)
কিডনী রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (প্রাক্তন), কিডনী বিভাগ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
এমবিবিএস,বিসিএস, এমডি (নেফ্রোলজি)
কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক (নেফ্রোলজি)
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
কিডনিতে পাথর থেকে সুস্থ থাকতে প্রাকৃতিকভাবে করণীয়
১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
দিনে ২.৫–৩ লিটার
গরমে বা শারীরিক পরিশ্রমে আরও বেশি
২. লবণ ও ফাস্টফুড কমান
রান্নায় অতিরিক্ত লবণ নয়
প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
৩. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
শাকসবজি ও ফলমূল
লেবু, কমলা (সাইট্রেট পাথর প্রতিরোধে সহায়ক)
৪. প্রাণিজ প্রোটিন পরিমিত খান
লাল মাংস সীমিত
মাছ ও ডাল পরিমিত
৫. প্রস্রাব চেপে রাখবেন না
সময়মতো প্রস্রাব করা অত্যন্ত জরুরি
৬. নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম
শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে
নিজে নিজে কোনো ঘরোয়া বা হারবাল ওষুধ গ্রহণ করবেন না।
কিডনিতে পাথর কি আবার হতে পারে?
হ্যাঁ। একবার পাথর হলে ভবিষ্যতে আবার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই—
নিয়মিত পানি পান করুন
খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখুন
নিয়মিত ডাক্তারের ফলোআপ করুন
কিডনিতে পাথর সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
১. কিডনিতে পাথর কি নিজে নিজে সেরে যায়?
ছোট পাথর অনেক সময় প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়, তবে বড় পাথরে চিকিৎসা দরকার।
২. কিডনিতে পাথর হলে কি সবসময় অপারেশন লাগে?
না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়াও চিকিৎসা সম্ভব।
৩. কিডনিতে পাথরের ব্যথা কি হঠাৎ হয়?
হ্যাঁ। পাথর নড়াচড়া করলে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হয়।
৪. কিডনিতে পাথর কি বিপজ্জনক?
সময়ে চিকিৎসা না করলে কিডনি ক্ষতি ও সংক্রমণ হতে পারে।
৫. কতদিন পরপর কিডনি পরীক্ষা করা উচিত?
একবার পাথর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ করা উচিত।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন Doctor Service BD তে
কিডনিতে পাথর একটি সাধারণ কিন্তু অবহেলা করলে জটিল হয়ে উঠতে পারে এমন সমস্যা। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত, উপযুক্ত চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনে প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চললে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুস্থ থাকা সম্ভব এবং অপারেশন এড়ানো যায়।
ব্যথা অবহেলা নয়—সময়মতো চিকিৎসাই কিডনি সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি।
Related Articles
Continue reading in কিডনি রোগ
কিডনি রোগ