জিনগত ত্রুটির কারণে শিশুর কোন কোন রোগ হতে পারে?
ডাঃ মোহতারামা মোস্তারী (মনিকা) • 29 Jan,2026 • 👁 334 Views
Category: শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
জিনগত ত্রুটির কারণে শিশুর কী কী রোগ হতে পারে? ডাউন সিনড্রোম, থ্যালাসেমিয়া, জন্মগত হৃদরোগসহ শিশুদের জিনগত রোগের কারণ, লক্ষণ ও করণীয় বিস্তারিত জানুন।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে জন্মগত ও জিনগত রোগের হার বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া প্রায় ৩–৬% শিশু কোনো না কোনো জন্মগত ত্রুটি বা জিনগত সমস্যায় আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার আরও উদ্বেগজনক, কারণ এখানে অনেক ক্ষেত্রেই প্রি-ম্যারিটাল জেনেটিক কাউন্সেলিং, গর্ভকালীন স্ক্রিনিং ও আধুনিক পরীক্ষা সহজলভ্য নয়।
জিনগত ত্রুটি মূলত বাবা-মায়ের জিন বা ক্রোমোজোমের অসামঞ্জস্যের কারণে হয়ে থাকে। অনেক সময় এই রোগগুলো জন্মের সময়ই প্রকাশ পায়, আবার কিছু রোগ ধীরে ধীরে শিশুর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণ প্রকাশ করে। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এসব রোগ শিশুর শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জিনগত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এখন সময়ের দাবি।
জিনগত ত্রুটি কী?
জিনগত ত্রুটি (Genetic Disorder) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশুর জিন বা ক্রোমোজোমে কোনো পরিবর্তন বা অসামঞ্জস্য ঘটে। মানবদেহে মোট ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। এদের কোনো একটি জোড়ায় অতিরিক্ত, কম বা ক্ষতিগ্রস্ত জিন থাকলে জিনগত রোগ সৃষ্টি হতে পারে। এই ত্রুটি বংশগতভাবে বাবা-মায়ের কাছ থেকে আসতে পারে অথবা গর্ভাবস্থায় নতুন করে সৃষ্টি হতে পারে।
জিনগত ত্রুটির প্রধান কারণ
জিনগত রোগ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাবা-মায়ের জিনে ত্রুটি থাকা, নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে, মায়ের বয়স বেশি হওয়া, গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ, রেডিয়েশন বা ক্ষতিকর ওষুধ গ্রহণ। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াও জিনের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে রোগ দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুনঃ শিশুর জন্ডিস কী? কেন হয়, কতটা বিপজ্জনক ও করণীয়
জিনগত ত্রুটির কারণে শিশুর যে রোগগুলো হতে পারে
নিচে শিশুদের মধ্যে দেখা যায় এমন গুরুত্বপূর্ণ জিনগত রোগগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো—
১️⃣ ডাউন সিনড্রোম (Down Syndrome)
ডাউন সিনড্রোম হলো একটি ক্রোমোজোমজনিত রোগ, যেখানে শিশুর ২১ নম্বর ক্রোমোজোমটি স্বাভাবিকের চেয়ে একটি বেশি থাকে। এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের মুখমণ্ডল সাধারণত চ্যাপ্টা হয়, চোখ একটু টানা টানা হয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ধীরগতির হয়। অনেক ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের জন্মগত ত্রুটি, থাইরয়েড সমস্যা ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাও দেখা যায়।
২️⃣ থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia)
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ, যেখানে শরীরে হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয় না। এর ফলে শিশু দীর্ঘদিন রক্তস্বল্পতায় ভোগে, বারবার রক্ত দিতে হয় এবং লিভার ও প্লীহা বড় হয়ে যেতে পারে। বাবা-মা উভয়েই বাহক হলে শিশুর এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
৩️⃣ জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Disease)
অনেক শিশুই জন্মগতভাবে হৃদযন্ত্রের গঠনতাত্ত্বিক ত্রুটি নিয়ে জন্মায়, যা অনেক ক্ষেত্রে জিনগত কারণে হয়ে থাকে। এতে শিশুর শ্বাসকষ্ট, ওজন না বাড়া, নীলাভ ত্বক ও অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি জীবনঝুঁকির কারণ হতে পারে।
৪️⃣ সিস্টিক ফাইব্রোসিস (Cystic Fibrosis)
এটি একটি জিনগত রোগ যা প্রধানত ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। এই রোগে শরীরের শ্লেষ্মা অস্বাভাবিকভাবে ঘন হয়ে যায়, ফলে শ্বাসকষ্ট, বারবার ফুসফুসে সংক্রমণ ও হজমে সমস্যা দেখা দেয়।
৫️⃣ স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (SMA)
এই জিনগত রোগে শিশুর পেশি দুর্বল হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে চলাফেরা ও শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি হয়। এটি একটি গুরুতর নিউরোমাসকুলার ডিজঅর্ডার এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবনের প্রথম কয়েক বছরেই মারাত্মক আকার ধারণ করে।
৬️⃣ হিমোফিলিয়া (Hemophilia)
হিমোফিলিয়া একটি বংশগত রক্তক্ষরণজনিত রোগ, যেখানে রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমে যায়। সামান্য আঘাতেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে। এটি সাধারণত ছেলে শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
৭️⃣ অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (ASD)
অটিজমের পেছনে জিনগত কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই রোগে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, কথা বলা ও আচরণগত বিকাশে সমস্যা দেখা দেয়। যদিও এটি পুরোপুরি জিনগত নয়, তবে পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কখন জিনগত রোগ সন্দেহ করবেন?
শিশুর জন্মের পর যদি স্বাভাবিক বিকাশে বিলম্ব, বারবার অসুস্থ হওয়া, অস্বাভাবিক শারীরিক গঠন, শেখার সমস্যা বা পরিবারে একই ধরনের রোগের ইতিহাস থাকে—তাহলে জিনগত রোগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা উচিত।
করণীয় ও প্রতিরোধের উপায়
জিনগত রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব না হলেও ঝুঁকি কমানো যায়। বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং, গর্ভাবস্থায় নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম ও জেনেটিক টেস্ট, নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে এড়িয়ে চলা এবং গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাবেন?
জিনগত রোগ সন্দেহ হলে প্রথমে শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician) দেখাতে হবে।
ডাঃ মোহতারামা মোস্তারী (মনিকা)
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমসিপিএস (শিশু), এমডি (নবজাতক)
নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন Doctor Service BD তে
Frequently Asked Questions (FAQ)
১️⃣ জিনগত রোগ কি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য?
সব জিনগত রোগ নিরাময়যোগ্য নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।
২️⃣ বাবা-মা সুস্থ হলেও কি শিশুর জিনগত রোগ হতে পারে?
হ্যাঁ, বাবা-মা বাহক হলে বা নতুন জিনগত পরিবর্তনের কারণে শিশুর জিনগত রোগ হতে পারে।
৩️⃣ গর্ভাবস্থায় কি জিনগত রোগ শনাক্ত করা যায়?
হ্যাঁ, আধুনিক পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক জিনগত রোগ গর্ভকালেই শনাক্ত করা সম্ভব।
৪️⃣ জিনগত রোগ কি বংশ পরম্পরায় চলে?
অনেক জিনগত রোগ বংশগতভাবে চলে, তবে সব রোগই বংশগত নয়।
৫️⃣ বাংলাদেশে জিনগত রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে কি?
হ্যাঁ, বড় মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কিছু জিনগত পরীক্ষা পাওয়া যায়।
জিনগত ত্রুটিজনিত রোগ শিশু ও পরিবারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। শিশুর ভবিষ্যৎ সুস্থ রাখতে জিনগত রোগ সম্পর্কে জানাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Related Articles
Continue reading in শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশু স্বাস্থ্য বার্তা
শিশু স্বাস্থ্য বার্তা