সেলুলাইটিস (Cellulitis) কী? লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
ডাঃ মুহাঃ আলমগীর রেজা • 13 Mar,2026 • 👁 198 Views
Category: চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
সেলুলাইটিস কী, কেন হয়, এটি কি ছোঁয়াচে রোগ, কী কী লক্ষণ দেখা যায় এবং কীভাবে চিকিৎসা করা হয়—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানুন এই সম্পূর্ণ গাইডে।
সেলুলাইটিস (Cellulitis)
সেলুলাইটিস একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর ত্বকের সংক্রমণজনিত রোগ। এটি সাধারণত ত্বকের গভীর স্তর এবং তার নিচে থাকা টিস্যুতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে হয়। এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
সেলুলাইটিস সাধারণত শরীরের যেকোনো অংশে হতে পারে, তবে এটি বেশি দেখা যায় পা, হাত, মুখ এবং শরীরের নিচের অংশে। আক্রান্ত স্থানে লালচে ভাব, ফোলা, ব্যথা এবং উষ্ণতা অনুভূত হয়।
অনেক মানুষ সেলুলাইটিসকে সাধারণ ত্বকের সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু এটি একটি গুরুতর সংক্রমণ হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
এই ব্লগে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো সেলুলাইটিস কী, কেন হয়, এটি ছোঁয়াচে কিনা, লক্ষণ কী, কীভাবে চিকিৎসা করা হয় এবং কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়।
সেলুলাইটিস কী
সেলুলাইটিস হলো ত্বকের একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ যা ত্বকের গভীর স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
এই সংক্রমণ সাধারণত ঘটে যখন কোনো ব্যাকটেরিয়া ত্বকের কাটা, ক্ষত বা ফাটলের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।
সবচেয়ে সাধারণ যে ব্যাকটেরিয়া সেলুলাইটিস সৃষ্টি করে তা হলো:
Streptococcus
Staphylococcus
এই ব্যাকটেরিয়াগুলো ত্বকের নিচে প্রবেশ করে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আক্রান্ত স্থানে ফোলা, ব্যথা এবং তীব্র লালচে ভাব দেখা যায়।
সেলুলাইটিস কেন হয়?
সেলুলাইটিস হওয়ার পিছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। সাধারণত ত্বকে কোনো ক্ষত বা সংক্রমণের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করলে এই রোগ হয়।
ত্বকের ক্ষত বা কাটা
যদি ত্বকে কোনো কাটা, আঁচড়, পোড়া বা ক্ষত থাকে তাহলে সেই জায়গা দিয়ে সহজেই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
এটি সেলুলাইটিস হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
পোকামাকড়ের কামড়
পোকামাকড়ের কামড়ের কারণে ত্বকে ছোট ক্ষত তৈরি হয়।
এই ক্ষত দিয়ে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করলে সেলুলাইটিস হতে পারে।
ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
ডায়াবেটিসের কারণে ক্ষত দ্রুত শুকায় না এবং ব্যাকটেরিয়া সহজে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে।
দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের শরীরে সংক্রমণ সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই কারণে তাদের সেলুলাইটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
ত্বকের অন্যান্য রোগ
একজিমা, ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা অন্যান্য ত্বকের রোগ থাকলে ত্বকের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
এর ফলে ব্যাকটেরিয়া সহজে ত্বকে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
সেলুলাইটিস কি ছোঁয়াচে রোগ?
অনেক মানুষ মনে করেন সেলুলাইটিস একটি ছোঁয়াচে রোগ এবং এটি একজন থেকে আরেকজনের শরীরে সহজে ছড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেলুলাইটিস সাধারণত ছোঁয়াচে রোগ নয়।
এই রোগ মূলত তখনই হয় যখন ব্যাকটেরিয়া ত্বকের ক্ষত বা ফাটলের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তির ত্বকের সংক্রমণ অন্য ব্যক্তির শরীরে সরাসরি ছড়িয়ে পড়া খুবই বিরল।
তবে যদি কারও ত্বকে খোলা ক্ষত থাকে এবং সে সংক্রমিত জায়গার সংস্পর্শে আসে, তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা থাকতে পারে।
তাই সংক্রমিত অংশ পরিষ্কার রাখা এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেলুলাইটিসের লক্ষণ
ত্বকে লালচে ভাব
সেলুলাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো আক্রান্ত স্থানে ত্বক লাল হয়ে যাওয়া।
এই লালচে অংশ ধীরে ধীরে বড় হতে পারে এবং ত্বক ফুলে যেতে পারে।
তীব্র ব্যথা
আক্রান্ত স্থানে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
কখনো কখনো এই ব্যথা এত বেশি হয় যে আক্রান্ত স্থানে স্পর্শ করলেও ব্যথা অনুভূত হয়।
ত্বক ফুলে যাওয়া
সেলুলাইটিসের কারণে আক্রান্ত স্থানে ফোলা দেখা যায়।
এই ফোলাভাব অনেক সময় দ্রুত বাড়তে পারে।
ত্বক উষ্ণ হয়ে যাওয়া
সংক্রমণের কারণে আক্রান্ত ত্বক সাধারণত উষ্ণ বা গরম অনুভূত হয়।
জ্বর
অনেক ক্ষেত্রে সেলুলাইটিস হলে জ্বর হতে পারে।
এটি শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার একটি লক্ষণ।
ক্লান্তি ও দুর্বলতা
সংক্রমণের কারণে শরীরে দুর্বলতা এবং ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
সেলুলাইটিস শরীরের কোন কোন স্থানে বেশি হয়
সেলুলাইটিস শরীরের যেকোনো অংশে হতে পারে। তবে এটি সাধারণত বেশি দেখা যায়:
পা
হাত
মুখ
পায়ের পাতা
বিশেষ করে পায়ে সেলুলাইটিস বেশি দেখা যায় কারণ পায়ে বেশি আঘাত বা ক্ষত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সেলুলাইটিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়
সাধারণত ডাক্তার আক্রান্ত ত্বক পরীক্ষা করে সেলুলাইটিস নির্ণয় করতে পারেন।
তবে কিছু ক্ষেত্রে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
যেমন:
রক্ত পরীক্ষা
ত্বকের নমুনা পরীক্ষা
আল্ট্রাসাউন্ড
সেলুলাইটিসের চিকিৎসা
সেলুলাইটিস একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হওয়ায় এর প্রধান চিকিৎসা হলো অ্যান্টিবায়োটিক।
ডাক্তার সাধারণত সংক্রমণের মাত্রা অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দেন।
অ্যান্টিবায়োটিক
হালকা সংক্রমণের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ইনজেকশন নিতে হতে পারে।
বিশ্রাম
আক্রান্ত অংশ বিশ্রামে রাখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে পায়ে সেলুলাইটিস হলে পা উঁচু করে রাখা উপকারী।
ব্যথানাশক ওষুধ
ব্যথা কমানোর জন্য ডাক্তার ব্যথানাশক ওষুধ দিতে পারেন।
সেলুলাইটিস প্রতিরোধের উপায়
সেলুলাইটিস প্রতিরোধের জন্য কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি।
ত্বক পরিষ্কার রাখা
ক্ষত হলে দ্রুত পরিষ্কার করা
পোকামাকড়ের কামড় থেকে সাবধান থাকা
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
ত্বক শুষ্ক না রাখা
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত:
ত্বক হঠাৎ লাল হয়ে যাওয়া
তীব্র ব্যথা
জ্বর
দ্রুত ফোলা বৃদ্ধি পাওয়া
সেলুলাইটিস হলে সাধারণত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের দেখানো হয়।
সেলুলাইটিস একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর ত্বকের সংক্রমণ। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে সঠিক চিকিৎসা এবং সচেতনতার মাধ্যমে এই রোগ সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ত্বকের কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সহকারী অধ্যাপক, চর্ম ও যৌন বিভাগ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
Related Articles
Continue reading in চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা
চর্মরোগ / ডার্মাটোলজি সমস্যা